হাতির করিডরে ট্রেন চালকদের মানসিক চাপ কমাতে ধ্যানের শরণ নিচ্ছে রেল

402

আলিপুরদুয়ার : কখনও ট্রেনের ধাক্কায় হাতি মারা যাচ্ছে। আবার কখনও জখম হয়ে তারা ফিরে যাচ্ছে জঙ্গলে। আলিপুরদুয়ার থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত ডুয়ার্সের রেল পথে হাতির মৃত্যু এখন সকলের চিন্তার  বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাতি মৃত্যু নিয়ে যেমন চিন্তিত সাধারণ মানুষ তেমনই চিন্তিত রেলকর্তারাও। রেল লাইনে এই হাতি মৃত্যু রুখতেই এবার চালকদের বিভিন্ন ট্রেনিংয়ের পাশাপাশি এবার ধ্যানের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে ভারতীয় রেল। ট্রেন চালানোর সময় হঠাৎ লাইনে হাতি চলে এলে কী করে মাথা ঠান্ডা রেখে ট্রেন চালাতে হবে, ধ্যানের মাধ্যমে সেই শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে চালকদের। ধ্যানের বিষয়ে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক সুহানন চন্দ বলেন, ‘ট্রেন লাইনে দুর্ঘটনা ঘটলে চালকদের মানসিক চাপ অনেকটাই বেড়ে যায়। ওই সময় তাঁরা কী করবেন বুঝে উঠতে পারেন না। ওই পরিস্থিতিতে চালকদের মাথা ঠান্ডা রাখতে ধ্যানের শরণ নেওয়া হচ্ছে।
উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, আলিপুরদুয়ার জংশন থেকে শিলিগুড়ি জংশন পর্যন্ত ১৬৫ কিলোমিটার রেল পথ আছে। এই রেলপথ ২০০৪ সালে মিটারগেজ লাইন থেকে ব্রডগেজ লাইনে উন্নীত করা হয়। ডুয়ার্সের এই রেলপথে ১১টি চিহ্নিত হাতির করিডর আছে। য়ার্সের এই রেলপথ দিয়ে প্রতিদিন এবং সাপ্তাহিক প্রায় ১২ থেকে ১৪ টি যাত্রীবাহি ট্রেন চলে। পাশাপাশি এই রুটে অসংখ্য মালবাহী ট্রেন চলাচল করে। ২০০৪ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ডুয়ার্সের এই রেলপথে মোট ১৬৮ টি হাতি ট্রেনের ধাক্কায় মারা গিয়েছে।  ট্রেনে কাটা পড়েছে বিলুপ্ত প্রায় শকুন, হরিন, পাইথন, লেপার্ড সহ অসংখ্য বন্যপ্রাণী।

বন্যপ্রাণীদের ধারাবাহিক মৃত্যু নিয়ে সরব হয় বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও পরিবেশপ্রেমী।দু-বছর আগে ডুয়ার্সের  রেলপথে ট্রেনের গতি কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় রেল। অভিযোগ, তারপরেও ট্রেন লাইনে হাতি বা অন্য বন্যপ্রাণীর মৃত্যু ঠেকানো যায়নি। সম্প্রতি রেলের আলিপুরদুয়ার ডিভিশন সিদ্ধান্ত নেয় হাতির করিডর ট্রেনের গতি বাড়ানো হবে। বিষয়টি নিয়ে তীব্র বিরোধীতা করে বিভিন্ন সংগঠন। তবে রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১৭ সালে রেল ডুয়ার্সের এই পথে কোর এলাকায় বিকাল পাঁচটা থেকে পরের দিন ভোর পাঁচটা পর্যন্ত ট্রেনের গতিবেগ কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ওই সময় জঙ্গলের কোর এলাকায় ট্রেনের গতিবেগ থাকবে ঘন্টায় দশ কিলোমিটার এবং বাফার এলাকায় গতিবেগ থাকবে ৪০ কিলোমিটার। সেই সিদ্ধান্তই বদলে আবার গতি বাড়াতে চাইছে রেল।
এখন মাঝেমধ্যেই ডুয়ার্সের এই রেলপথে জঙ্গল থেকে হাতি এসে পড়ছে। তবে ট্রেন চালকদের তৎপরতায় অনেক দুর্ঘটনাও এরানো যাচ্ছে। ট্রেন চালকদের এর জন্য প্রশংসাও করছে বিভিন্ন মহল। কিন্তু এতসব সত্ত্বেও দুর্ঘটনা পুরোপুরি এড়ানো যাচ্ছে না। তাই ডুয়ার্স এলাকায় চলাচলকারী ট্রেনের চালকদের বিশেষ কাউন্সেলিংয়ের ব্যাবস্থা করা হচ্ছে। সেইসঙ্গে ধ্যানের মাধ্যমেও ট্রেন চালকদের মস্তিষ্ক ঠিক রাখতে কৌশল নিচ্ছে রেল দপ্তর। আবার হাতির করিডর এলাকায় চলাচলকারি ট্রেনগুলিতে একজন করে অভিজ্ঞ চালককে রাখা হচ্ছে।
আলিপুরদুয়ার ডিভিশনের এক অভিজ্ঞ ট্রেন চালক বলেন, ধ্যানের কোনো বিকল্প নেই। নিয়মিত ধ্যান মানুষকে অনেক সহনশীল হতে শেখায়। এই বিষয়গুলি ট্রেন চালানোর সময় বিশেষ কাজ দেয়। তাই  অবসর সময়ে চালকদের ধ্যানের নানা বিষয় শেখাচ্ছেন এ বিষয়ে অভিজ্ঞরা।
উত্তর পূর্ব সীমান্ত রেলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক সুহানন চন্দ বলেন, ‘বন্যপ্রানীর কোর এলাকা সহ অন্য এলাকাগুলিতে বিশেষ করে রাতের দিকে অভিজ্ঞ চালকদের রাখা হচ্ছে। আবার চালকদের কাউন্সেলিং করা হচ্ছে। তবে আমরা এখন জোর দিচ্ছি চালকদের ধ্যানের উপর। ধ্যানের মাধ্যমে চালকদের মানসিক চাপ কমানো, মস্তিষ্ক সচল রাখা সহ অন্যান্য বিষয়ে জোর দিচ্ছি। নিয়মিত ধ্যান করার ফলে চালকরা এখন মানসিক দিক থেকে ফিট থাকছেন। ফলে ট্রেন লাইনে হঠাৎ কোনো হাতি বা অন্য বন্যপ্রাণী চলে এলেও উপস্থিত বুদ্ধি চালকরা কাজে লাগাতে পারছেন। তাই আগামীদিনে সব চালকেই ধ্যানের শরণ নিতে আমরা পরামর্শ দিচ্ছি।’

- Advertisement -

তথ্য- ভাস্কর শর্মা