সৌরভ রায়, কুশমণ্ডি : শোনা গিয়েছিল আর কিছুদিনের মধ্যে শুরু হবে ট্রেন চলাচল। সেইমতো রাজ্য সড়কের দুধারের জমি নিয়ে তৈরি হয়েছে ওভারব্রিজের পিলার। মাপা হয় জমিও। কিন্তু সেসবই সার। আদৌ রেলগাড়ি ঝমাঝম-এর সেই পরিচিত শব্দ কুশমণ্ডির মানুষ কোনোদিনও শুনতে পাবেন কিনা, সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে কুশমণ্ডি, বুনিয়াদপুর, কালিয়াগঞ্জ সহ বালুরঘাটবাসীর মনে।

স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী পেরিয়ে যাওয়ার পরে রেলস্টেশন চালু হয় বালুরঘাটে। অবশেষে দেশের রেল মানচিত্রে স্থান পায় দক্ষিণ দিনাজপুর। তারপর থেকে বালুরঘাটের সঙ্গে কলকাতা ও মালদা হয়ে এবং ঘোরা পথে বুনিয়াদপুর, গাজোল, মালদা হয়ে শিলিগুড়ির সঙ্গে রেলপথে সংযোগ ঘটে বালুরঘাটের। কিন্তু বুনিয়াদপুর থেকে কুশমণ্ডিকে মাঝে রেখে কালিয়াগঞ্জ হয়ে বালুরঘাটের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন হলে এই ঘুরপথের প্রয়োজন হত না। বাসিন্দারা জানান, মালদা হয়ে বালুরঘাট থেকে শিলিগুড়ি যেতে গেলে ১০০ কিলোমিটার রাস্তা বেশি ঘুরতে হয়। কিন্তু বুনিয়াদপুর থেকে কুশমণ্ডি হয়ে কালিয়াগঞ্জ পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার রেললাইন তৈরি করা হলে প্রায় ১০০ কিলোমিটার রাস্তা কমে যেত। প্রতিবছরই এই এলাকার কয়ে লক্ষ মানুষ তাকিয়ে থাকেন রেল বাজেটের দিকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হতাশ হওয়া ছাড়া আর কিছুই জোটে না তাঁদের ভাগ্যে। বালুরঘাট থেকে যাঁরা সাংসদ নির্বাচিত হন তাঁদের কাছেও এলাকার উন্নয়নের চেয়ে বড়ো লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় বুনিয়াদপুর-কালিয়াগঞ্জ রেললাইন স্থাপনের দাবিকে আরও জোরালো করে তোলা। তবে বারবার দাবি উঠলেও কোনো পদক্ষেপই করেনি রেল।

অথচ রেললাইন বসছেই, এমন পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল কয়েক বছর আগে। রেলদপ্তর থেকে জমি জরিপ, জমির পরিসংখ্যান তৈরির জন্য ব্লক অফিসে বসে তার খসড়া পর্যন্ত তৈরি হয়ে গিয়েছিল। প্রথম দিকে জমি দিতে বহু মানুষ আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু পরে ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাঁরা সকলেই জমি দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। সেসময় কোন পথে বুনিয়াদপুর থেকে কালিয়াগঞ্জে গিয়ে রেল মিশবে তার হিসাবনিকেশ করা, সেই লাইনে পিলার বসানোর কাজ করে কোথায় ওভারব্রিজ হবে সেসব কাজও শুরু করেছিল রেল। কিন্তু কোনো অজানা কারণে আবার সব বন্ধ হয়ে যায়। ব্রিজের পিলার তৈরির পাট গুটিয়ে রেল চলে যায়, তাও প্রায় বছর ছয়েক আগে। আদৌ আর কিছু হবে কিনা এখন সেই প্রশ্নই শুধু কুরে কুরে খায় স্থানীয়দের। গত লোকসভায় বালুরঘাট থেকে সংসদে গিয়েছিলেন তৃণমূলের অর্পিতা ঘোষ। সংসদে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি জানিয়েছিলেন, বুনিয়াদপুর ভায়া কুশমণ্ডি, কালিয়াগঞ্জের ৩০ কিলোমিটার পথে রেল যুক্ত করা হলে বহু মানুষের সময় বাঁচবে। অকারণে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচবে রেলও। কিন্তু কোনো লাভের লাভ হয়নি।

বর্তমানে রাজনৈতিক পাট বদল হয়েছে। বালুরঘাটে সাংসদ হয়েছেন বিজেপির সুকান্ত মজুমদার। তিনি জানিয়েছেন, রেলদপ্তরের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তবে নতুন করে কাজ শুরু না হলে কিংবা রেলদপ্তর কাজের কথা ঘোষণা না করা অবধি কেউই আর এসব বিশ্বাস করতে চাইছেন না। বুনিয়াদপুর ভায়া কুশমণ্ডি হয়ে কালিয়াগঞ্জ রেল উন্নয়ন কমিটির কুশমণ্ডির সংগঠনের অন্যতম সদস্য রাজকুমার জালান বলেন, এটা একটা বঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই না। বুনিয়াদপুর ভায়া কুশমণ্ডি হয়ে কালিয়াগঞ্জ রেল যোাগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে সমগ্র এলাকার অর্থনৈতিক চিত্র আরও ভালো হত। কালিয়াগঞ্জের বিশিষ্ট কবি করুণাময় চক্রবর্তী বলেন, এটি মূলত রাজনৈতিক টানাপোড়েন। মোদ্দা কথা, রেলের কাছে বুনিয়াদপুর ভায়া কুশমণ্ডি হয়ে কালিয়াগঞ্জ পর্যন্ত রেললাইন স্থাপনের প্রস্তাব চেপে ধরার মতো ওজনদার কেউ নেই। তাই কাজ হচ্ছে না।