দুই মেয়েকে নিয়ে নারী সচেতনতার প্রচার করবেন রামপ্রসাদ

145

তমালিকা দে, শিলিগুড়ি : করোনা পরিস্থিতিতে তিনি রাস্তায় বেরিয়েছিলেন। তখন তাঁর সঙ্গে ছিল দুই ছেলে। তাদের নাম ফাটাকেষ্ট আর অ্যান্টনি। করোনার পর তিনি আবার গ্রামের পথে পথে ঘোরার তোড়জোড় করছেন। এবার সঙ্গে থাকবে তাঁর দুই মেয়ে বিউটি আর সুন্দরী। প্রত্যেকবারই তিনি নতুন নতুন গল্প বলেন। তিনি মানে রামপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়। উত্তরবঙ্গের একমাত্র ভেন্ট্রিলোকুইস্ট- কথা বলা পুতুলের জাদুকর।

সত্যজিৎ রায়ের ভূতুড়ে গল্পের কথা বলা পুতুল ভূতের মতো ভয় দেখানো নয়, মাটিগাড়ার শরৎনগরের বাসিন্দা রামপ্রসাদবাবুর পুতুলরা সামাজিক বার্তা দেয়। কখনও তারা গ্রামের মানুষকে বোঝায় কীভাবে প্রাণঘাতী করোনার মোকাবিলা করতে হবে, কখনও তারা মেয়েদের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরে। এবার যেমন শহর ও গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে মহিলাদের বিউটি ও সুন্দরী বোঝাবে, নির্যাতনের হাত থেকে কীভাবে মহিলারা রক্ষা পাবেন, নারী শিক্ষার প্রয়োজন কতটা, সরকারি কোন প্রকল্পের সুবিধা মহিলারা পাবেন, গর্ভবতী মহিলাদের শরীর সুস্থ রাখার জন্য কী করা দরকার, ঋতুচক্র চলাকালীন মহিলাদের কী কী পরিচ্ছন্নতা অবলম্বন করা দরকার, মেয়েদের এমন নানা খুঁটিনাটি বিষয়।

- Advertisement -

রামপ্রসাদবাবুর জন্ম দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাটে। ১৩ বছর ধরে শিলিগুড়িতে থাকলেও শেষ কয়েকমাস তাঁর ঠিকানা মাটিগাড়া। ছোটবেলা থেকেই অন্যরকম কাজের প্রতি তাঁর আগ্রহ প্রবল। দূরদর্শনে পাপেট শো দেখেই স্বরক্ষেপণের কৌশল আয়ত্ত করেছেন তিনি। তারপর সেই নেশা থেকেই তৈরি করে চলছেন একের পর এক চরিত্র। রামপ্রসাদবাবুর তৈরি এই কথা বলা পুতুলরা খুব সহজেই মন কেড়ে নেয় দর্শকদের। পুতুলের প্রতি ভালোবাসা থেকেই এই কাজকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি। প্রতিবছর জানুয়ারি মাসে একটি করে নতুন পুতুল তৈরি করেন রামপ্রসাদবাবু। পুতুলটির সাজসজ্জা, পোশাক ও নাম কী হবে, তা তিনি ঠিক করেন। তারপর পুতুল তৈরি হয়ে গেলে শহর থেকে গ্রামের রাস্তায় ঘুরে ঘুরে তিনি সাধারণ মানুষের মনোরঞ্জন করেন।

মাঝেমধ্যে সরকারি প্রচারমূলক কাজে ডাক পান তিনি। গল্পের ফাঁকে রামপ্রসাদবাবু বলেন, মাস কয়েক আগেকার কথা। পূর্ব বর্ধমানে পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে সমস্যা হচ্ছিল। তাঁরা কোয়ারান্টিন সেন্টারে যেতে চাইছিলেন না। সেখানকার বিডিও আমাকে ডাকলেন। তারপর বললেন, আপনি ওঁদের বোঝান। ফাটাকেষ্ট আর অ্যান্টনিকে নিয়ে চলে গেলাম। মজার গল্প বলে ওঁদের সবাইকে বোঝালাম। ওঁরা বুঝলেন, কোয়ারান্টিনে না গেলে সকলেরই বিপদ। তার থেকে ওঁদের পরিবারেরও নিস্তার নেই। কাজটা কত সহজে হয়ে গেল। উত্তরবঙ্গের নানা জায়গা থেকেও ডাক পড়ে। অনেক এনজিও ডেকে পাঠায়। তাদের সঙ্গে কথা বলে স্টেশনে ঘুরে ঘুরে সরকারি প্রকল্পের কতবার প্রচার করেছি, বলছেন রামপ্রসাদ। স্বরক্ষেপণের বিশেষ কৌশল ভেন্ট্রিলোকুইজিম। যার মাধ্যমে ঠোঁট না নাড়িয়ে কথা বলা সম্ভব। এই বিশেষ কায়দা রপ্ত করতে হয় নিবিড় অনুশীলনের মাধ্যমে। আর ভেন্ট্রিলোকুইস্টের কোলে বসে থাকা পুতুলের ধরন দেখে মনে হয় সেই যেন কথা বলছে। রামপ্রসাদবাবু বলেন, ছোটবেলা থেকেই এই কাজের প্রতি আগ্রহ। তাই এটাই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছি। বর্তমানে মহিলাদের সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে। তাই দুই মেয়েকে তৈরি করছি। ওরা মহিলাদের কথা বলবে। একাজে মজা আছে, পরিচিতিও আছে। কিন্তু রামপ্রসাদবাবুর আক্ষেপ, শো করে যে কটা টাকা পাই তাতে সংসার চলে না। তাতে আমার খুব একটা দুঃখ নেই। সবচেয়ে খারাপ লাগে এটা ভেবে যে সরকারি প্রকল্পের এত প্রচার করি, কিন্তু সরকার আমাকে কোনও স্বীকৃতি দেয় না। আমি কোনওদিন সরকারি কোনও সম্মান পাইনি।