অসুস্থ বাবার টোটো নিয়ে রাস্তায় রশিতা

রহিদুল ইসলাম, চালসা : মাতৃভমি সিনেমাটার কথা মনে আছে? কন্যাভ্রূণ হত্যার পরিণতি যে কী মারাত্মক হতে পারে তা মণীশ ঝা পরিচালিত ২০০৩ সালের এই সিনেমায় ভয়াবহভাবে ফুটে উঠেছিল। কালকির চরিত্রে টিউলিপ যোশির অভিনয় ভারতের প্রত্যন্ত প্রান্তগুলিতে তো বটেই, দেশের ঝাঁ চকচকে শহরগুলিতেও কন্যাভ্রূণ হত্যার রূঢ় বাস্তব সবার সামনে তুলে ধরেছিল। এই সিনেমা যখনকার সেই সময় মেটেলি ব্লকের বড়দিঘি চা বাগানের রশিতা পৃথিবীর আলোই দেখেনি। তবে মণীশ যদি আজ রশিতাকে দেখতেন তবে নিশ্চিতভাবে নতুন একটি সিনেমা তৈরির কথা ভাবতেন। অনেকটাই প্রচারের আলোর বাইরে থাকা এই এলাকার বাসিন্দা চালসা গয়ানাথ বিদ্যাপীঠের নবম শ্রেণির এই পড়ুয়া যা করছে তা জানলে অনেকেরই চোখ কপালে উঠবে। বিশেষ করে যাঁরা পুত্রসন্তানের আশায় দিনরাত মাথা খুঁটে মরেন তাঁরা নতুনভাবে জীবনকে তলিয়ে দেখতে বাধ্য হবেন।

বড়দিঘি চা বাগানের রঘুনাথ লাইনের বাসিন্দা মার্টিন টোপনো আগে দিনমজুরি করতেন। স্ত্রী এই বাগানেই কাজ করেন। একটু ভালোভাবে সংসার চালানোর জন্য বছর ছয়েক আগে তিলতিল করে জমানো টাকার কিছুটা খরচ করে মার্টিন একটি টোটো কেনেন। এরপরই সংসারের হাল ফেরা শুরু করে। টোটো চালিয়ে যে টাকা আয় হচ্ছিল তা মার্টিনের গরিবের সংসারে কিছুটা স্বস্তি বয়ে এনেছিল। কিন্তু মানুষটির কপালে সুখ সইলে তো! রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি সহ নানা শারীরিক সমস্যার কারণে মার্টিন মাস ছয়েক হল কর্মক্ষমতা হারান। আজকাল চোখে ঠিকঠাক দেখতে পান না, শরীরে জোর না থাকায় ঠিকমতো হাঁটাচলা দায়। স্ত্রী ও তিন মেয়েছে নিয়ে তাঁর সংসার। বাগানে কাজ করে স্ত্রী যে টাকা রোজগার করেন তা দিয়ে পাঁচজনের সংসার চালানো কঠিন। তার ওপর রয়েছে মার্টিনের ওষুধপত্রের খরচ। হাজার কষ্ট হলেও মার্টিন অবশ্য তাঁর মেয়েদের স্কুলে পড়াচ্ছেন।

- Advertisement -

কথায় বলে, পড়াশোনা চোখ খুলে দেয়। মার্টিনের বড় মেয়ে রশিতা তারই জ্বলন্ত উদাহরণ। বাবার অসুস্থ হয়ে পড়া ও মায়ে প্রচণ্ড খাটনি দেখে সে আর স্থির থাকতে পারেনি। বাবার কেনা টোটোর চালক হয়ে সে রাস্তায় নেমে পড়ে। চালককের আসনে নিষ্পাপ ফুটফুটে একরত্তি মেয়েছিকে দেখে অনেকেই প্রথম প্রথম বেজায় অবাক হয়েছিলেন। পরে গোটা ঘটনা জেনে বাসিন্দারা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। তাঁদের অনেকেই আজকাল রশিতার টোটোয় ওঠেন। এই সুবাদে মার্টিনের সংসারের হাল ফের কিছুটা ফেরা শুরু হয়েছে। মার্টিনের মুখে হাসি। তবে মেয়ের নিরাপত্তার বিষয়টাও তাঁকে সমানে ভাবায়। তাই সময় পেলে অসুস্থ শরীরে মাঝে মাঝে তিনি টোটোয় যাত্রীর আসনে সওয়ার হন।

করোনার জেরে স্কুল বন্ধ থাকায় রশিতা এখন না হয় টোটোর পিছনে সময় দিতে পারছে। কিন্তু পরিস্থিতি একটু ঠিক হলে স্কুল নিশ্চিতভাবে খুলবে। মার্টিন চান, মেয়ে যেন সেই সময় থেকে নিয়মিতভাবে স্কুলে যায়। রশিতাও তাই-ই চায়। কিন্তু ছোট দুই বোন ও মা-বাবার জন্য সে অনেকটাই চিন্তিত। সমস্যা মেটাতে সে প্রশাসনের কাছে আবেদন জানিয়েছে। এলাকার গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য তথা মাটিয়ালি-বাতাবাড়ি ২ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য মনোজ মাহালি বলেন, সরকারিভাবে মার্টিনের চিকিৎসা করা হচ্ছে। কোনওভাবেই যাতে রশিতার পড়াশোনার কোনও ক্ষতি না হয় সেজন্য আমরা পরিবারটির পাশে রয়েছি।