নিয়োগ কেলেঙ্কারি এবার ভোটের ইস্যু আলিপুরদুয়ারে

126

ভাস্কর শর্মা, আলিপুরদুয়ার : বনসহায়ক থেকে আইসিডিএস কর্মী নিয়োগকে কেন্দ্র করে একাধিক অভিযোগ এসেছে আলিপুরদুয়ারে। পাশাপাশি স্থানীয়স্তরে বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার পরেও কিছু দপ্তরে নিয়োগ করা হয়নি। আবার প্রায় দুবছর আগে পরীক্ষা হলেও তার ফল আজও প্রকাশিত হয়নি। আলিপুরদুয়ারে সরকারি চাকরি নিয়ে এই অব্যবস্থাকেই এবার ভোটের ইস্যু করছে বিজেপি সহ অন্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। চাকরির মতো সমস্যাকে বিরোধীরা হাতিয়ার করায় চাপে পড়েছে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। পাশাপাশি জেলার চাকরিপ্রার্থী যুবকরাও বিরোধীদের ইস্যুকে সমর্থন করেছেন। তবে শাসকদল তৃণমূল দাবি করেছে, জেলাস্তরে কোনও নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ নেই। উলটে রাজ্যজুড়ে যে চাকরি হচ্ছে তাতে জেলার চাকরিপ্রার্থীরা কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছেন।

বিজেপির জেলার সহ সভাপতি জয়ন্ত রায় বলেন, বনসহায়ক, আইসিডিএস পরীক্ষা নিয়ে জেলায় শাসকদলের নেতারা দুর্নীতি করেছেন। আবার ডিপিএসসিতে কর্মী নিয়োগের জন্য দুবছর আগে পরীক্ষা হলেও আজও তার ফল প্রকাশ হয়নি। জেলায় স্থানীয়স্তরে দশ বছরে কোনও নিয়োগ হয়নি। চাকরির এই বিষয়টি আমরা বিধানসভা ভোটের ইস্যু করছি। তৃণমূলের জেলা সভাপতি মৃদুল গোস্বামী বলেন, রাজ্যজুড়ে উন্নয়নের পাশাপাশি কর্মসংস্থান হয়েছে। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকারই কোনও নিয়োগ করতে পারেনি। তাই এবারের ভোটে কেন্দ্রের বিরুদ্ধেই চাকরিপ্রার্থীরা ভোট দেবেন।

- Advertisement -

প্রায় দুবছর আগে আলিপুরদুয়ার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদ কর্মী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয়। তারপর বেশ কয়েকটি পদে লিখিত পরীক্ষাও হয়। কিন্তু ওই পদগুলিতে আজও কাউকে নিয়োগ করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। এছাড়া প্রায় দেড় বছর আগে সমগ্র শিক্ষা অভিযানেও একাধিক পোস্টে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল জেলা প্রশাসন। ওই একইরকম পদে রাজ্যের বেশ কয়েকটি জেলায় নিয়োগ হলেও আলিপুরদুয়ারে আজও তা না হওয়ায় ওই বিজ্ঞাপ্তি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

জেলাস্তরে এই দুটি দপ্তরে নিয়োগের বিষয়টি ছাড়াও রাজনৈতিক দলগুলি আইসিডিএস নিয়োগ কেলেঙ্কারিকেই প্রচারের অন্যতম ইস্যু করছে। আলিপুরদুয়ার জেলায় প্রায় এক-দেড় বছর আগে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলিতে কর্মী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। এরপর গত জানুয়ারি মাসে তার পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। কিন্তু গত ১৭ জানুয়ারি আইসিডিএস কর্মী নিয়োগের পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। ওইদিন আলিপুরদুয়ার শহর ও অন্য দুটি এলাকা মিলিয়ে মোট আটটি কেন্দ্রে পরীক্ষা বাতিল হয়ে যায়। ওই বাতিল হওয়া পরীক্ষা নেওয়ার জন্যই গত ২৯ জানুয়ারি বৈঠকে বসেছিলেন নিয়োগ কমিটির সদস্যরা। বৈঠক শেষ হতেই জানা যায়, আইসিডিএস পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা আলিপুরদুয়ারের এসডিও শ্রী রাজেশকে বদলি করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে জেলাজুড়ে চাঞ্চল্য ছড়ায়। ওইদিন বৈঠক থেকে বেরিয়ে নিয়োগ কমিটির চেয়ারম্যান মোহন শর্মা জানিয়েছিলেন, ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকেই বাতিল হওয়া পরীক্ষা ফের নেওয়া হবে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত ওই নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই শাসকদলের বিরুদ্ধে বিজেপি এবং বামেদের ছাত্র সংগঠন আইসিডিএস পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে আন্দোলন শুরু করেছে। জেলায় বনসহায়ক নিয়োগ নিয়ে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে বলে বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলির অভিযোগ। বনসহায়ক নিয়োগকে কেন্দ্র করে খোদ মুখ্যমন্ত্রীও দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন। পালটা অভিযোগ জানিয়েছেন প্রাক্তন বনমন্ত্রী তথা বর্তমান বিজেপি নেতা রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়ও। ওই নিয়োগে তৃণমূলের জেলা সভাপতি মৃদুল গোস্বামী সুপারিশ করেছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন রাজীব। এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই জেলাজুড়েই চাঞ্চল্য ছড়ায়।

তৃণমূলের আমলে একের পর এক নিয়োগ জেলায় হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি বলেই অভিযোগ। আর এটাকেই বিধানসভা ভোটে প্রচারের ইস্যু করছে বিজেপি ও অন্য রাজনৈতিক দলগুলি। বিজেপির জেলা যুব সভাপতি বিপ্লব দাস বলেন, জেলাস্তরে চার থেকে পাঁচটি দপ্তরে চাকরি হওয়ার কথা থাকলেও একটিও সঠিকভাবে নিয়োগ হয়নি। প্রতিটি নিয়োগেই শাসকদল তৃণমূলের নেতাদের আত্মীয়দের নাম আছে। কোন চাকরি কাকে দেওয়া হবে সেই ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে নেতাদের কোন্দল আছে। এতে সাধারণ মেধাবী চাকরিপ্রার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। জেলার চাকরির অবস্থার বিষয়টি আমরা ছাত্র-যুবদের মধ্যে প্রচার করছি। বিধানসভা ভোটে নিয়োগ দুর্নীতির বিষয়টি আমরা ভোট প্রচারের ইস্যু করব।

ডিওয়াইএফআই-এর জেলা সভাপতি বাপন গোপ বলেন, তৃণমূলের আমলে কোনও চাকরির পরীক্ষাই সুষ্ঠুভাবে হয়নি। স্বজনপোষণে ভরে গিয়েছে। আলিপুরদুয়ার জেলার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। বেকারদের চাকরি নেই। আমরা শিক্ষিত বেকারদের নিয়ে তাই চাকরির দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছি। বিধানসভা ভোটে ছাত্র-যুবরা এবার ভুল করেও তৃণমূলকে ভোট দেবেন না। তবে বাম-কংগ্রেস জোট ক্ষমতায় এলে তৃণমূলের আমলে হওয়া সব নিয়োগ নিয়ে তদন্ত হবে।

শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস ইতিমধ্যেই বিধানসভা ভোটের প্রচার শুরু করে দিয়েছে। তবে তৃণমূল নেতারা যেখানেই প্রচারে যাচ্ছেন জেলার বেকার ছাত্র-যুবদের প্রশ্নের মুখে পড়ছেন। মহিলারাও তৃণমূলের নেতাদের আইসিডিএস নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন করছেন। ওই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে চাপ বাড়ছে শাসকদলের নেতাদের। তৃণমূলের এক নেতা বলেন, ভোট প্রচারে গিয়ে স্বচ্ছভাবে একটি নিয়োগও হয়নি বলেই শুনতে হচ্ছে। কীভাবে যে তা সামলাব তাই ভেবে পাচ্ছি না। বেকারদের ভোট কী করে পাব, তা নিয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনার দরকার।