বন্ধ বাগান, অনাদরে পড়ে আছে হাটেবাজারের গাড়ি

1043

শুভজিৎ দত্ত,  নাগরাকাটা : সে ছিল সোনাঝরা দিন। তখন হাতিশালে হাতি থাকত, ঘোড়াশালে ঘোড়া। চিড়িয়াখানায় গর্জন করত চিতাবাঘ।  শিং বাড়িয়ে খাঁচা থেকে উঁকি দিত চিতল হরিণ। শুধু কী তাই! মালিকের বাংলোর লনে শোভা বাড়াত দেশি-বিদেশি গাড়ির হরেক সম্ভার। মাঝে মাঝেই সেখানে শুটিং হত বাংলা সিনেমার। অশোক কুমার, বৈজয়ন্তীমালা, শমিত ভঞ্জ, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, ছায়া দেবী, কামু মুখোপাধ্যায়ের মতো দিকপাল অভিনেতা-অভিনেত্রীদের শুটিংয়ে ব্যবহৃত হত সেইসব বনেদি চার চাকার গাড়ি। কয়েকটির অস্তিত্ব এখনও আছে। তবে যা দশা, তা যেন গোটা বাগানেরই করুণ প্রতিচ্ছবি। একদা আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে ওঠা গাড়ি এখন জঙ্গলে ঢাকা গ্যারাজ ঘরে অনাদরে পড়ে রয়েছে। অযত্ন আর পরিচর্যার অভাবে ঝোপ বেড়ে তৈরি হওয়া জঙ্গলেই ডেরা বেঁধে থাকে বুনো হাতির পাল।

বন্ধ রেডব্যাংক চা বাগানের মালিক ধীরেন্দ্রনাথ ভৌমিকের বৈভবের বাংলোটির ঠিক পাশেই থাকত তাঁর শখের গাড়ি। ১৯৬৭ সালে মুক্তি পাওয়া খ্যাতনামা পরিচালক তপন সিংহের হাটেবাজারে-র শুটিংয়ে ব্যবহৃত হয়েছিল সেইসব গাড়ি। তাতে এক ডাক্তারের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন অশোক কুমার। সিনেমায় তাঁর নাম ছিল ডাঃ অনাদি মুখোপাধ্যায়। নায়িকার ভমিকায় ছিলেন বলিউডের গ্ল্যামার কুইন বৈজয়ন্তীমালা। বাগানেরই এক বাবুস্টাফের আবাসনকে সিনেমায় ডাঃ অনাদি মুখোপাধ্যায়ের বাসভবন হিসেবে দেখানো হয়েছিল। সেই বাড়ির দশাও এখন গাড়ির মতোই ভগ্নপ্রায়। সিনেমায় বাগান মালিকের গাড়িই ছিল হিরো অশোক কুমারের গাড়ি। রেডব্যাংক ও লাগোয়া নানা জায়গায় শুটিং হয়েছিল। ১৯৬৯ সালে মুক্তি পাওয়া আরেকটি বাংলা ছায়াছবি বনজ্যোৎস্নাতেও ব্যবহার করা হয়েছিল ওই সমস্ত গাড়ি। সেই ছবিতে ছিলেন শমিত ভঞ্জ, রুমা দাশগুপ্তরা। তাতে বাগানের নিজস্ব আস্তাবলের ঘোড়া ব্যবহার হয়েছিল ভিলেন কামু মুখোপাধ্যায়ে একটি শটে। বরেণ্য চিত্রগ্রাহক বীরেন গুপ্তর কথা ও শুটিংয়ে দৃশ্যপট ক্যামেরায় ধরে রাখার সুবাদে স্পষ্ট মনে করতে পারেন রেডব্যাংকের প্রবীণরা। ১৯৭৮-এ মুক্তি পাওয়া জর্জ বেকার ও রাখি গুলজার অভিনীত সাড়া জাগানো ছবি চামেলি-মেমসাহেবের  বাংলা ভার্সনের কিছু অংশের শুটিংও রেডব্যাংকে হয়েছিল। সেইসব সোনালি স্মৃতি এখনও বুকে ধরে রেখেছেন রেডব্যাংকের বড়বাবু দেবব্রত পাল। পঞ্চাশ বছর আগের কথা পাড়তেই দৃশ্যত নস্টালজিক হয়ে ওঠা ওই প্রবীণ বললেন, অশোক কুমার-বৈজয়ন্তীমালাদের শুটিং দেখার জন্য কৌশলে স্কুল কামাই করতাম। যে ট্রাকে করে বানারহাটের স্কুলে যেতাম তার ড্রাইভারকে বন্ধুবান্ধবরা মিলে ২-৩ টাকা চাঁদা তুলে বকশিস দেওয়া হত। এরপরই ওই কাকু ঘোষণা করতেন গাড়ি খারাপ হয়ে গিয়েছে। সকাল ১১টার আগে তা আর ভালো হত না। মুচকি হেসে দেবব্রতবাবু বলেই চলেন, এজন্য বাবার হাতে মার পর্যন্ত খেয়েছি। যখনই শুটিং হত মালিকের বাংলোই হয়ে উঠত হিরো-হিরোইনদের থাকার আস্তানা। আক্ষেপ ঝরে পড়ে তাঁর কণ্ঠে। আরেক বাগানবাবু সুশীল সরকার বলেন, রেডব্যাংক ও লাগোয়া ডায়না নদীর চরে দিনভর না খেয়ে শুটিং দেখেছি। গোটা বাগান সেসময় গমগম করত। রেডব্যাংকের আভিজাত্য ছিল আশপাশের বাগানগুলির ঈর্ষার কারণ। এখন এখানে শুধুই বেঁচে থাকার লড়াই। চা বাগান বিশেষজ্ঞ রামঅবতার শর্মা বলেন, শুটিং দেখতে কতবার যে সেখানে গিয়েছি ইয়ত্তা নেই।

- Advertisement -