গুরুর অভাবে গান ভুলছে রিজেন্ট হানিইটার্সরা

55

গান সবাই গায়, সুর-রাগ আয়ত্ত করতে পারে কজন? গুরুর কাছে উপযুক্ত তালিম আর দৃঢ় অধ্যবসায়ের ফলেই কণ্ঠে খেলে সাত সুর। তবে শুধু আমাদের ক্ষেত্রে নয়, গায়ক পাখিদেরও দরকার হয় গুরুর। ডিম ফোটার পর থেকেই নিজের প্রজাতির অন্য পাখিদের গান শুনে তা আয়ত্ত করে পাখির ছানাও। কিন্তু সময়ে সঙ্গে সঙ্গে গান ভুলতে বসেছে গাইয়ে পাখিরাও (Songbirds)। কিছু কিছু গাইয়ে পাখির সংখ্যা দিন-দিন হ্রাস পাওয়ায় ছানা পাখিরা গান শেখার সুযোগই পাচ্ছে না। আর তার জেরে সঠিক সুরে গান গাওয়া ভুলছে ওইসব গাইয়ে পাখি।

সাধারণত সঙ্গীকে আকর্ষিত করতেই সুরেলা শব্দে ডাকে গাইয়ে পাখিরা। ডিম ফুটে জন্মাবার পর প্রথম এক বছরের মধ্যে অন্য বয়স্ক পাখিদের গাওয়া গান থেকে তা নকল করতে শেখে গাইয়ে পাখিরা। সময়ে সঙ্গে সঙ্গে নানা কারণে পাখিদের সংখ্যা কমায় সেই গান শেখার সুযোগই পাচ্ছে না ছানা পাখিরা। ফলে সঙ্গীকে আকর্ষণের জন্য ভুল সুরে গান গাইছে তারা। স্বাভাবিকভাবেই, হেড়ে গলায় গান না-পসন্দ মেয়ে পাখিদের। অবশেষে, মিলনের জন্য সঙ্গীই খুঁজে পাচ্ছে না অধিকাংশ পুরুষ গাইয়ে পাখি।

- Advertisement -

প্রায় পাঁচ বছর ধরে গাইয়ে পাখি রিজেন্ট হানিইটার্সের (Anthochaera phrygia) ওপর গবেষণা করছেন পরিবেশবিদ অধ্যাপক রস ক্রেটস। একটা সময় কালো ও হলুদ রংয়ের এই পাখি প্রায় সারা অস্ট্রেলিয়াজুড়েই দেখা যেত। কিন্তু মানুষের অত্যাচারে এখন সেই সংখ্যা অনেকটাই কমে গিয়েছে। প্রাকৃতিক পরিবেশে শুধুমাত্র অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব অংশে মাত্র ৩০০-৪০০টি রিজেন্ট হানিইটার্স পাখি জীবিত রয়েছে। রস জানান, একটা সময় বড় বড় দলে এই পাখি আকাশে উড়ে বেড়াত। এখন অধিকাংশ পুরুষ পাখিই একাকী থাকে। ফলে জীবনের প্রথম বছরে অন্য পুরুষ পাখিদের থেকে গানের তালিম সহজে পায় না রিজেন্ট হানিইটার্সের ছানা।

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রস ক্রেটস বলেন, মানবসন্তান কথা বলা শেখে বাড়ির বড়দের মুখের ভাষা শুনেই। একইভাবে গাইয়ে পাখিদের ছানাও বড় পাখিদের গান শুনে নিজেরা তা গাইতে শেখে। কিন্তু অন্য পাখিদের থেকে ছোট অবস্থায় কোনও গান না শুনলে, সেই পাখি বড় হয়ে নিজেরাও গান গাইতে পারে না। তবে গবেষণায় দেখা গিয়েছে, নিজের প্রজাতির অন্য পাখির গান না শুনতে পেরে অন্য প্রজাতির গাইয়ে পাখির গান অনেক সময় রপ্ত করে নিচ্ছে রিজেন্ট হানিইটার্সের ছানারা। প্রায় ১২ শতাংশ পুরুষ রিজেন্ট হানিইটার্স নয়সি ফ্রিয়ারবার্ড, ব্ল্যাক ফেসড কাক্কুশ্রিকার্সের মতো অন্য গাইয়ে পাখির গান নকল করে। তবে সেগুলি একেবারেই সুরেলা হয় না। ফলে মেয়ে রিজেন্ট হানিইটার্সরা সেই গানে আকৃষ্ট হয় না। রসের কথায়, কিছু পুরুষ রিজেন্ট হানিইটার্সের অদ্ভুত গানে মেয়ে পাখিরা একেবারেই আকৃষ্ট হয় না। সেই কারণে ওই পুরুষ পাখিকে সঙ্গী হিসেবে বেছে নেয় না তারা। সম্প্রতি প্রসিডিংস অফ দ্য রয়াল সোসাইটি বি জার্নালে রস ক্রেটসের এই গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির কনজারভেশন বায়োলজিস্ট পিটার মেরা বলেন, একটা প্রজাতির পাখির সংখ্যা ভয়ানকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এখন দেখা যাচ্ছে গানের কারণে সেই পাখির বংশবিস্তারেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। এটা কিন্তু খুব বড় একটা সমস্যা। পাখিদের নিজস্ব সুরেলা ডাক হারিয়ে গেলে সেই পাখি অবলুপ্তির দিকে এগিয়ে যায়, এই ঘটনা তার প্রমাণ। অন্টারিওর উইলফ্রিড লরিয়ার ইউনিভার্সিটির বিহেভিয়েরাল ইকোলজিস্ট স্কট র‌্যামসের বক্তব্য, পাখিদের গান অনেকটা মানুষের পাত্রপাত্রীর বিজ্ঞাপনের মতো। গান গেয়ে পুরুষ পাখি নিজের সম্পর্কে অন্য স্ত্রী পাখিদের জানায়। এখন পুরুষ রিজেন্ট হানিইটার্সরা গান ভুলে গেলে বা অন্য পাখিদের গান নকল করলে স্ত্রী পাখিরা তা বুঝতে পারছে না। ফলে তারা ওই বিশেষ পুরুষ পাখিটির সঙ্গে মিলনে আকৃষ্ট হচ্ছে না। স্টোনি ব্রুক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক কার্ল স্যাফিনা বলেন, পাখিদের গান বাঁচিয়ে রাখা যে কত জরুরি, তা আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। কিছু কিছু জিনিস যা কোনও একটি প্রজাতির বেঁচে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সেটা কিন্তু সে জন্মগতভাবে জানে না। তাকে সময়ে সঙ্গে সঙ্গে শিখতে হয়। এটা সব পশুপাখির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ইতিমধ্যেই রিজেন্ট হানিইটার্সের সুরেলা গান হারিয়ে যাওয়া আটকাতে তৎপর হয়েছেন রস ক্রেটস ও তাঁর দলবল। ওই পাখির ছানারা যাতে নিজেদের গান শিখতে পারে, তার জন্য জঙ্গলে স্পিকার বসিয়ে তাতে রেকর্ড করা রিজেন্ট হানিইটার্সের ডাক চালাচ্ছেন তাঁরা। আশা করা যায়, এইভাবে রিজেন্ট হানিইটার্সদের অবলুপ্তি আটকাতে পারবেন ওই বিজ্ঞানীরা।