কোচবিহার পুরসভায় পাঁচ জেল ফেরত কর্মীকে পুনর্বহাল

কোচবিহার : সরকারি প্রকল্পে প্রায় দুকোটি টাকা আর্থিক কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত পাঁচ জেল ফেরতকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পুনর্বহাল করে বিতর্কে কোচবিহার পুরসভা। ওই পাঁচজনই চুক্তিভিত্তিক কর্মী। ইতিমধ্যেই তাঁরা মাসাধিককাল জেল খেটেছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে প্রিভেনশন অফ করাপশন অ্যাক্টে মামলা চলছে। জেল থেকে বেরোনোর পর এঁদের সকলকেই পুরোনো পদে নিযুক্ত করেছে পুর কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে একজনকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। পুর কর্তৃপক্ষের সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে পুরসভার অন্দরেই। পুনর্বহাল হওয়া অভিযুক্তরা পুরসভার নথি বা তাঁদের বিরুদ্ধে থাকা প্রমাণপত্র লোপাট করতে পারেন বলে আশঙ্কা করছে বিজেপি। এই ইশ্যুতে পুরসভার বিরোধী দল বামেদের নীরব থাকা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন। এ বিষয়ে মুখ খোলেননি পুরসভার চেয়ারম্যান ভূষণ সিং।

কাজ না করেই সরকারি প্রকল্পের ১ কোটি ৭৭ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা তছরুপের অভিযোগ ওঠে কোচবিহার পুরসভায়। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে বিষয়টি নিয়ে কোচবিহার কোতোয়ালি থানায় পুরসভার চেয়ারপার্সন রেবা কুণ্ডু, তাঁর ছেলে তথা ১১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার শুভজিৎ কুণ্ডু, পুরসভার এগজিকিউটিভ অফিসার সইফুল্লা মোল্লা এবং হিসাবরক্ষক কণকেন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে মামলা দায়ে হয়। তদন্তের পর সেই মামলায় পুলিশ আরও সাতজনের নাম যুক্ত করে। তাঁদের মধ্যে পুরসভার ছয় কর্মী এবং একজন ঠিকাদার আছেন। অভিযুক্ত ছয় কর্মীর মধ্যে রাজীব গুহচৌধুরী, চণ্ডীদাস দেবনাথ এবং বিপ্লবকুমার দত্ত চুক্তিভিত্তিক সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার পদে কর্মরত ছিলেন। স্বপনকুমার সরকার পুরসভায় চুক্তিভিত্তিক করণিক ছিলেন। অন্য দুই অভিযুক্ত বিপ্লব মণ্ডল এবং প্রণবেন্দ্র সরকার একটি সংস্থার কর্মী হিসাবে পুরসভায় লেবার সুপারভাইজার পদে কাজ করতেন।

- Advertisement -

২০১৮ সালের শুরুতেই ছয় অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আদালতে গেলে বিচারক তাঁদের জেল হেপাজতের নির্দেশ দেন। জেল থেকে বেরোনোর পর স্বপনকুমার সরকার বাদে অন্য পাঁচ কর্মীকে পুরোনো পদে বহাল করে পুরসভা কর্তৃপক্ষ। পুরকর্মীদের একাংশ জানিয়েছেন, অভিযুক্ত রাজীব গুহচৌধুরীকে বিভিন্ন সময় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসানো হয়েছে। চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত সহকারী এবং পুরসভার তথ্য আধিকারিক হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন বলে বিরোধী দলের কাউন্সিলারদের অনেকেই জানিয়েছেন। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে তার প্রামাণ্য নথিপত্র পুরসভাতেই রয়েছে। আদালতে এখনও দুর্নীতির মামলা চলছে। এই পরিস্থিতিতে অভিযুক্তরা সেইসব নথি বিকৃত বা লোপাট করতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন বিজেপি নেতৃত্ব। দলের কোচবিহার জেলা সম্পাদক এবং আইনজীবী রাজু রায় বলেন, অভিযুক্তরা কেউই স্থায়ী কর্মী নন। পুলিশি তদন্তে তাঁরা দোষী প্রমাণিত হয়েছেন বলেই তাঁদের নাম চার্জশিটে যুক্ত করা হয়েছে। তাই যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁরা নির্দোষ প্রমাণিত না হন ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁদের বরখাস্ত করা উচিত ছিল পুর কর্তৃপক্ষের। সেটা না করে তাঁদের পুনর্বহাল করার পেছনে অন্য কোনও চক্রান্ত আছে বলেই মনে হচ্ছে। পুরসভা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না করলে আমরা আদালতের দ্বারস্থ হব।

পুনর্বহাল ইশ্যুতে পুরসভার বিরোধী দল বামেদের নীরব থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রাজুবাবু। পুরসভার বিরোধী দলনেতা সিপিএমের মহানন্দ সাহা বলেন, স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত পুরসভা তৈরিতে আমরাই শুরু থেকে আন্দোলন করে যাচ্ছি। অভিযুক্ত কর্মীদের পুনর্বহাল নিয়ে যখন বোর্ড মিটিংয়ে আলোচনা হয়েছিল, তখন আমরা আপত্তি জানিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের আপত্তি তৃণমূলের চেয়ারম্যান পাত্তা দেননি। ভূষণ সিং চেয়ারম্যান হওয়ার পরই পুনর্বহাল করা হয়েছিল পাঁচ অভিযুক্তকে। যা নিয়ে তৃণমূলকে কটাক্ষ করেছেন কংগ্রেস নেতা মির মোশারফ হোসেন। তিনি বলেন, তৃণমূল চেয়ারম্যান বদল করেছে ঠিকই। কিন্তু কোনও চেয়ারম্যানই দুর্নীতিবাজদের ছাড়া চলতে পারছেন না। তবে অভিযুক্তদের পুনর্বহাল নিয়ে মুখে কুঁলুপ এঁটেছেন পুরসভার চেয়ারম্যান ভূষণ সিং। ওই বিষয়ে জানতে ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। মেসেজ পাঠালেও উত্তর দেননি। পুরসভার ভাইস চেয়ারপার্সন আমিনা আহমেদও এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি।