ট্রাকের চাকা ঘুরছে না, আধপেট খেয়ে দিন কাটছে শ্রমিকদের

267

মহম্মদ হাসিম, নকশালবাড়ি : ট্রাকের চাকা ঘুরছে না, আধপেটা খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন নকশালবাড়ি ব্লকের হাতিঘিসা গ্রাম পঞ্চায়েতের চানাপট্টির বাসিন্দারা। চেঙা নদীর ধারে বিরসা মুন্ডা কলেজের পাশে এই ছোট গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দা ঠেলাগাড়িতে ছোলা, মটর বিক্রি করেন। সেইজন্য স্থানীয়রা এই গ্রামের নাম দিয়েছেন চানাপট্টি। কিন্তু বাবা, ঠাকুরদাদের এই পেশা ধরে না রেখে গ্রামের যুবকরা এখন কেউ ট্রাক চালান, কেউ আবার ট্রাকে শ্রমিকের কাজ করেন। কেউ সারাদিন ধরে নদীতে বালি-পাথর বাছাইয়ের কাজ করেন, কেউ মজুরের কাজ করে সংসার চালান। লকডাউনের আগে পর্যন্ত প্রতিদিন কাকভোরে ট্রাক নিয়ে বেরিয়ে যেতেন তাঁরা। সারাদিন ধরে মেচি, বালাসনের মতো নদীগুলিতে বালি-পাথর বাছাই করে ট্রাকে ভরা হত। সন্ধ্যা হতেই সেই ট্রাক নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দিয়ে সারাদিনের পারিশ্রামিক নিয়ে ঘরে ফেরা। আর তারপরেই উনুন জ্বলত চানাপট্টির শ্রমিক পরিবারগুলিতে। লকডাউনের আগে পর্যন্ত এভাবেই দিন কাটত সঞ্জয় মাহাতো, সিকান্দার মাহাতো, প্রভাকর মাহাতোদের। এই গ্রামে প্রায় ৮৫ জন ট্রাকের শ্রমিক রয়েছেন যাঁরা মেচি ও বালাসন নদীতে বালি-পাথর বাছাই করেই পরিবারের ভরণ-পোষণ করতেন। কিন্তু লকডাউনের জন্য এঁরা প্রত্যেকেই কাজ হারিয়েছেন। গত তিন মাস ধরে এলাকার ১২টি ট্রাক গ্রামের রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। নদীর কাজ বন্ধ দেখে ট্রাকের মালিকপক্ষ শ্রমিকদের মাথা থেকে হাত তুলে নিয়েছে। ঘরে যেটুকু সঞ্চয় ছিল তাও গত তিন মাস ধরে বসে খেতে খেতে শেষ হয়ে গিয়েছে। ফলে এখন আধপেট খেয়ে দিন কাটছে চানাপট্টির শ্রমিক পরিবারগুলির।

স্থানীয়দের কথায়, র‌্যাশনের পাঁচ কেজি চাল দিয়ে সারা মাস যায় না। এলাকার সকলেই এখন ত্রাণের অপেক্ষায় রয়েছেন। গ্রামে ঢুকতেই দেখা গেল খালি ট্রাকের নীচে বসে বেশ কয়েকজন যুবক লকডাউন নিয়ে আলোচনা করছেন। যাঁরা পরিবারের জন্য পয়সা রোজগার করতে সারাদিন নদীতে পড়ে থাকতেন তাঁরা এখন আবার কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে তা নিয়ে আলোচনা করছেন। কথায় কথায় বিষ্ণু মাহাতো বলেন, ট্রাকে বড় বড় পাথর লোড-আনলোড করে সারাদিনে যা মজুরি পাই তা দিয়ে ছেলেপুলে নিয়ে সংসার চালাই। কিন্তু লকডাউনের জেরে সেই কাজ বন্ধ হয়েঠে। ঘরে বসে বসে সংসার চালাতে গিয়ে ভাঁড়ার শূন্য হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, আমরা দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে চেঙা সেতুর ধারে বসবাস করছি। ভোটও দিচ্ছি। কিন্তু উন্নয়ন বলতে এখানে কিছুই হয়নি। জব কার্ড থাকলেও এখানে একশো দিনের কাজ হয় না। গ্রামে নিকাশিনালা বলতে কিছু নেই। সামান্য বৃষ্টিতে চেঙা নদীর জল গ্রামে ঢুকে যায়। রাস্তাঘাট কাদায় ভরে যায়। পানীয় জলের জন্য এখনও ভরসা কুয়োর জল। পঞ্চায়েত প্রধান এবং প্রশাসনের কোনও আধিকারিক আমাদের খোঁজ নেন না। পেশায় ট্রাকচালক সঞ্জয় মাহাতো বলেন, লকডাউনের জন্য বড় বড় নির্মাণকাজ এখন বন্ধ রয়েছে। সেচ দপ্তর থেকেও বাঁধের কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। তাই ট্রাকের মালের চাহিদা না থাকায় আমরা বেকার হয়ে পড়েছি। তিনি বলেন, এদিকে ব্যাংকের লোনের সাপ্তাহিক কিস্তি, বিদ্যুৎ বিল, বাচ্চাদের স্কুলের ফি নিয়ে আমরা নাজেহাল হয়ে পড়েছি। জানি না আবার কবে আমরা দুপয়সা রোজগার করব। সমস্যার কথা স্বীকার করে নিয়েছেন হাতিঘিসা গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান জ্যৈষ্ঠমোহন রায়। তিনি বলেন, এখানকার বাসিন্দারা ট্রাকে শ্রমিকের কাজ করে দিনযাপন করে। কিন্তু এখন ট্রাক চলাচল বন্ধ থাকায় তারা বেকার হয়ে পড়েছে। একশো দিনের কাজও দেওয়া সম্ভব হয়ে উঠছে না। স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্যকে বলেছি এখানকার উন্নয়নমূলক কিছু প্রকল্পের প্রস্তাব দিতে। নকশালবাড়ির বিডিও বাপি ধর বলেন, গ্রামের বাসিন্দারা তাঁদের সমস্যার কথা আমাকে জানাননি। তবে খোঁজ নিয়ে তাঁদের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নেব।

- Advertisement -