সরকার আসে-যায়, হিলি সীমান্তের কথা এখন ভাবে না কেউ…

81

বিধান ঘোষ, হিলি : সরকার আসে, যায়। কিন্তু সীমান্তের যুবকদের কর্মসংস্থানের পথ পালটায় না, রুটও বদলায় না। কাজের অভাবে যুব সম্প্রদায় ক্রমশ অপরাধ জগতে হারিয়ে যাচ্ছে। দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে সীমান্তে চোরাকারবার। বিধানসভা নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলির ইস্তাহারেও সীমান্তবাসীদের নিয়ে কোনও প্রতিশ্রুতি নেই। ভোটের মরশুমে রাজনৈতিক দলগুলির ইস্তাহারে একাধিক জনমুখী ঘোষণা থাকলেও সীমান্তের বিপথগামী যুবকদের সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার কোনও উল্লেখ নেই।

কেন্দ্র রাজ্য কোনও সরকারই এই বিষয়ে উদ্যোগ না নেওয়ায় ক্ষুদ্ধ সীমান্তবাসী। বিরাট সংখ্যায় যুবক যৌবনেই পথভ্রষ্ট হওয়ায় বাড়ছে ক্ষোভ। তাঁদের প্রশ্ন, সরকার  মাওবাদীদের সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে চাকরির ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু হিলি সীমান্তের যুব সম্প্রদায়কে অপরাধের জগত থেকে ফিরিয়ে আনতে ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন? অপরাধ থেকে ফেরাতে কেন তাঁদের সরকারি চাকরি দেওয়া হবে না?

- Advertisement -

দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার ভারত বাংলাদেশ সীমান্তের হিলি ব্লকের বেশকিছু অংশ এখনও উন্মুক্ত। ওই উন্মুক্ত সীমান্তে দিয়ে চলে চোরাচালান। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সীমান্ত এলাকায় কর্মসংস্থানের অভাব রয়েছে। এলাকার স্কুলপড়ুয়া থেকে যুবকেরা চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। কলেজ উত্তীর্ণ হয়ে কাজ না মেলায় যুবকরা পাচারের কাজে যুক্ত হয়ে পড়ছেন। অল্প সময়ে কম পরিশ্রমে বেশি আয়ে দিকেই ঝোঁক তাঁদের। উল্লেখযোগ্যভাবে স্কুলছুটের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে হিলিতে। গোরু, হিরোইন, নিষিদ্ধ কাফ সিরাফ, ইয়াবা ট্যাবলেট, নিষিদ্ধ ইঞ্জেকশান, প্রসাধনী সামগ্রী থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশের চোরা ব্যবসায় জড়িয়ে বিপথগামী হচ্ছে বিরাট সংখ্যায় নতুন প্রজন্ম।

স্থানীয় কলেজ পড়ুয়া জয় মণ্ডল বলেন, সীমান্তের যুবকদের কথা কেউ ভাবচ্ছে না। বহু ছেলে কাজ না পেয়ে চোরাচালানের ব্যবসায় নেমে পড়ছেন। স্কুল ছাত্র থেকে কলেজ পড়ুয়ারা অনেকেই অচিরেই অবৈধ পেশায় চলে যাচ্ছে। অনেকেই পুলিশের জালে পরে যাচ্ছে। জীবন একপ্রকার শেষ হয়ে যাচ্ছে। কর্মসংস্থান থাকলে কেউ অবৈধ ব্যবসায় যেত না। আমাদের নিয়ে তো কেউ ভাবেই না। বিধানসভা নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলির ইস্তাহারেও সীমান্তবাসীদের নিয়ে কোনও প্রতিশ্রুতি নেই। রাজ্যে যখন রাজবংশী পরিষদ, নস্যশেখ পরিষদ গঠন হচ্ছে তখন সীমান্ত সমস্যা ও উন্নয়নের জন্য সীমান্ত পরিষদ গঠন করা বা স্পেশাল প্যাকেজ ঘোষণা করা দরকার। নির্বাচনে সীমান্ত উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের দাবি জানাই।

স্থানীয় কৃষক সুবল মাহাত বলেন, সীমান্তের ছেলেরা কর্মসংস্থানের ও আয়ের উৎস হিসেবে চোরাচালানের পথ বেছে নিচ্ছে। পড়াশোনা শেষ করার পর কাজ না পেয়ে গোরুর লেজ ধরছে। সরকার আমাদের দিকে তাকিয়ে দেখলে এমন কি আর হত? সীমান্তের মানুষ উপেক্ষিত হয়ে রয়েছে। বিধানসভা নির্বাচনে কোনও দলই তাদের ইস্তাহারে সীমান্তের মানুষের যন্ত্রণার কথা তুলে ধরেনি।

আরএসপির বালুরঘাট কেন্দ্রের বিদায়ি বিধায়ক বিশ্বনাথ চৌধুরী বলেন, আমরা ইস্তাহারে কর্মসংস্থানের কথা বলেছি। রাজ্যের তৃণমূল সরকার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করল না। কেন্দ্রের বিজেপি সরকারও তাই করল। কর্মসংস্থানের করুণ দশার জন্য সীমান্তের ছেলেরা অপরাধ জগতে নাম লেখাচ্ছেন। সীমান্ত উন্নয়ন পর্ষদ গঠন বা প্যাকেজের ব্যবস্থা করার জন্য বাসিন্দাদের দাবিতে আমার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। অপরাধ জগত থেকে যুবকদের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে চাকরির ব্যবস্থা করার প্রয়োজন রয়েছে। সংযুক্ত মোর্চা ক্ষমতায় এলে সীমান্তের দাবিগুলিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

জেলা তৃণমূলের কোঅর্ডিনেটর সুভাষ চাকী বলেন, সীমান্ত সমস্যা সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে। সেজন্যই আমাদের ইস্তাহারে বিষয়টি স্থান পায়নি। প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সীমান্ত এলাকার উন্নয়ন করেছে। অপরাধের জগত ওইভাবে বন্ধ করা যায় না। কর্মসংস্থানের অভাবে বেকার যুবকরা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন, একথা আমরা মানতে নারাজ। তৃণমূলের বিধায়ক থাকাকালীন প্রচুর ছেলের কাজ হয়েছে। সিভিক ভলান্টিয়ার, হাসপাতালে, পুরসভায় কাজ দেওয়া হয়েছে। কর্মতীর্থে দোকান দেওয়া হয়েছে। আগামীদিনে মানুষ আশীর্বাদ করলে আরও কর্মসংস্থান দেওয়া হবে।

জেলা বিজেপির সাধারণ সম্পাদক বাপি সরকার বলেন, বিজেপির রাজ্যস্তরে ইস্তাহার বেড়িয়েছে। জেলা ও বিধানসভাস্তরে ইস্তাহার প্রকাশ করা হবে। লোকাল স্তরের ইস্তাহারে সীমান্ত এলাকা উন্নয়ন নিয়ে বার্তা দেওয়া হবে। সীমান্তে অপরাধ ও কর্মসংস্থান নিয়ে সমস্যা রয়েছে। কর্মসংস্থানের মধ্যে দিয়ে সমস্যা মেটানোর জন্য চেষ্টা করতে হবে। সীমান্তের অন্ধকার গলি থেকে যুব সম্প্রদায়কে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে বিজেপি সমস্তরকমভাবে চেষ্টা করবে। সীমান্ত উন্নয়ন পর্ষদ বা প্যাকেজ ঘোষণার দাবিতে বিজেপির সমর্থন রয়েছে। ক্ষমতায় এলে বিজেপি বিষয়গুলি গুরুত্ব দিয়ে দেখবে।