জমির স্বত্ব মেলেনি, ক্ষোভ জমছে  জয়গাঁবাসীর মনে

238

কয়েক প্রজন্ম ধরে এই দেশ, এই রাজ্যে বসবাস করে আসছেন। কিন্তু ভিটেমাটির কোনও বৈধ কাগজপত্র নেই। এটাই ভুটান সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ জনপদ জয়গাঁর বাস্তব চিত্র। বাম থেকে তৃণমূল, কোনও দলই জয়গাঁবাসীদের জমি লিজ দিতে উদ্যোগ নেয়নি। ফলে ক্ষোভ জয়গাঁর অনাচকানাচে। কী বলছেন জয়গাঁর বাসিন্দারা, খোঁজ নিলেন মোস্তাক মোরশেদ হোসেন।

জয়গাঁ : জয়গাঁর অধিকাংশ বসতভিটে, দোকান দাঁড়িয়ে আছে হয় কোনও জমিদারের ফেলে যাওয়া জমি কিংবা নদীর চরের উপর। একটা বাড়ির সঙ্গে সেঁটে রয়েছে আর একটা বাড়ি। সেই বাড়ি বিক্রি হলেও হয়েছে দশ বিশ টাকা দামের নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প কিংবা সাদা কাগজে লেখা চুক্তির উপর। বাসিন্দাদের অভিযোগ, দশকের পর দশক ধরে দাবি জানিয়ে জমির স্বত্ব মেলেনি। ফলে, গোটা জয়গাঁর বাসিন্দাদের বেশিরভাগেরই আদতে কোনও বৈধ কাগজপত্র নেই। তবে জয়গাঁর জমি লিজ সংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে আলিপুরদুয়ার জেলা প্রশাসন।

- Advertisement -

সীমান্ত শহর হিসেবে পরিচিত হলেও জয়গাঁ আদতে দুটি গ্রাম পঞ্চায়েতের এলাকাভুক্ত। বর্তমানে অত্যন্ত ঘন জনবসতিপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিণত হলেও জয়গাঁ কিন্তু মূলত গড়ে উঠতে শুরু করে সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে। ভুটান গেটের কাছে ভারতীয় ভূখণ্ডে তখনও দাপিয়ে বেড়াতেন জমিদাররা। ভুটানিদের সঙ্গে ব্যবসাবাণিজ্যের স্বার্থে সীমান্তের গেটের আশপাশে বসত গড়তে শুরু করেন মূলত কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলার বাসিন্দারা। জয়গাঁর প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, আগে জমিদারের জমিতে ঘর তুলতে মাসে পাঁচ টাকা ভাড়া গুনতে হত। এরপর ক্ষমতায় আসে বামফ্রন্ট। বন্ধ হয় জমিদারকে ভাড়া দেওয়া। পাততাড়ি গোটাতে শুরু করেন জমিদাররা। বাড়তে থাকে  দখল।

জয়গাঁর প্রবীণ বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, জয়গাঁ সহ সন্নিহিত এলাকায় বেশ কয়েকজন ছোট ও বড়মাপের জমিদার ছিলেন। জমি বেহাত হলেও তাঁদের বংশধরদের কেউ কেউ আজও রয়েছেন জয়গাঁয়। বর্তমানে যে এলাকাটি জয়গাঁ নামে পরিচিত, সেটির তখনকার নাম ছিল দ্যুতিবস্তি। দ্যুতিবস্তিতে বাজার বসত। একসময় সেটি জমজমাট ব্যবসা কেন্দ্রে পরিণত হয়। দ্যুতিবস্তির বেশিরভাগ জমি অন্য এক জমিদারের মালিকানাভুক্ত থাকলেও যে জায়গায় বাজার বসত, সেই এলাকার জমির মালিক ছিলেন জয়বাহাদুর ছেত্রী। জয়বাহাদুরের নাম অনুসারে জায়গাটির নাম একসময়ে জয়গাঁও এবং পরবর্তীতে জয়গাঁ হিসেবে পরিচিত হয়। ততদিনে রাজ্যের ক্ষমতায় এসেছে বামফ্রন্ট। চালু হয়েছে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা।

জয়গাঁর দারাগাঁওয়ে বাসিন্দা নুর আমিন বলেন,বহু বছর ধরে বসবাস করছি জয়গাঁয়। মঙ্গলাবাড়ির প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি। একাধিকবার জমি নিয়ে সমীক্ষা করা হয়েছে। তবে আজ পর্যন্ত জমির  লিজ পাইনি। আরএসপির জেলা কমিটির সদস্য তথা অবিভক্ত জলপাইগুড়ি জেলা পরিষদের প্রাক্তন সভাধিপতি জন ফিলিপ খালকো বলেন, জয়গাঁয় এখন যাঁরা বসবাস করছেন, তাঁদের বেশিরভাগই বহিরাগত। একসময় সেখানে আদিবাসী আর নেপালিরাই বসবাস করতেন। তবে, বর্তমানে যাঁরা বসবাস করছেন, তাঁদের জমির স্বত্ব (লিজ) দেওয়া দরকার। আরএসপির আলিপুরদুয়ার জেলা কমিটির সম্পাদক সুনীল বণিক বলেন, কংগ্রেস জমানা থেকে জয়গাঁবাসীর জমির লিজের জন্য দলীয়ভাবে চেষ্টা করে আসছি। তবে বাম আমলেও সেই চেষ্টা সফল হয়নি। বর্তমান সরকারও বিষয়টি নিয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে না। বিজেপির আলিপুরদুয়ার জেলা সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত রায় বলেন, জয়গাঁর বাসিন্দাদের জমি লিজের বিষয়ে বাম-তৃণমূল উভয় জমানাতেই রাজ্য সরকার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা রক্ষা করেনি। ২০২১ সালে বিজেপি ক্ষমতায় এসে জয়গাঁবাসীর জমির লিজ সংক্রান্ত বিষয়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেবে। তৃণমূলের আলিপুরদুয়ার জেলা সভাপতি মৃদুল গোস্বামী বলেন, জয়গাঁর বিষয়টি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াকিবহাল রয়েছেন। জমির সমস্যা মেটাতে তিনি নিজেই উদ্যোগ নিয়েছেন। তাই আমরা আশাবাদী। জয়গাঁ-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান ফুরবা লামা বলেন, দশকের পর দশক ধরে আবেদন জানিয়ে জয়গাঁর ৯৫ শতাংশ মানুষ জমির লিজ পাননি। আলিপুরদুয়ারের অতিরিক্ত জেলাশাসক (এলআর) দীপঙ্কর পিপলাই বলেন,লিজের জন্য সাড়ে তিন হাজার আবেদনপত্র জমা পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রক্রিয়া চলছে।