মোমো বানানো ছেড়ে শ্রমিকের কাজের খোঁজে রংটং

281

শমিদীপ দত্ত, রংটং : একসময়ে শহর থেকে শান্তির খোঁজে আসা বিভিন্ন বয়সিদের কোলাহলে হারিয়ে যেত ঝরনার জলের আওয়াজ। সেলফির মাঝেই টেবিলজুড়ে বসে থাকা যুবক-যুবতীদের চাহিদা অনুয়াযী মোমো, চাউমিন তৈরিতে ব্যস্ত থাকতেন সংযোগ, রাকেশরা। তবে করোনার থাবায় সেই ছবি বদলে গিয়েছে। খাবারের ছোট দোকানগুলির ফাঁকা চেয়ারগুলি পুরোনো দিনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। মোমো, চাউমিনের খোঁজে আসা খাদ্যরসিকদের বাহবা পাওয়ার দিনগুলি এখন স্মৃতির পাতায়। কেউ আধপেটা খেয়ে রয়েছেন। কেউ পরিবারের মুখে ভাত তুলে দিতে শ্রমিকের কাজের খোঁজে পাহাড়ি পথে ঘুরছেন। জঙ্গল, পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে যে রংটং শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে রেহাই দিত, সে নিজেই এখন যেন প্রাণহীন।

সুকনা পেরিয়ে রাস্তার দুধারে মহানন্দা অভয়ারণ্য। জঙ্গলের স্নিগ্ধতার মাঝখান দিয়ে যাওয়া জাতীয় সড়কে একপলকে হারিয়ে যায় যাবতীয় ক্লান্তি। কয়েক মাস আগেও মানুষের কোলাহলে গমগম করত রংটং। পাহাড়ি পথ বেয়ে রংটংয়ে উঠতেই বেশ কিছু বাড়ি রয়েছে। বাড়ির সামনের অংশে রংবেরংয়ে সাইন বোর্ডে হাতছানি দিচ্ছে মোমো, চাউমিন। রংটংয়ে এসে সেই মোমো, চাউমিনের হাতছানি এড়িয়ে গিয়েছেন, এমন মানুষের সংখ্যা কমই। পর্যটক ও খাদ্যরসিকদের মন জয় করেই সংসার চলে ৪০টি পরিবারের।

- Advertisement -

একের পর এক মোমো, চাউমিনের অর্ডার সামলাতে ব্যস্ত থাকা সংযোগ থাপা এখন চেয়ে থাকেন খালি চেয়ার-টেবিলগুলির দিকে। নিজের মেয়েকে দেখিয়ে বললেন, পরিবার বলতে এই মেয়ে, স্ত্রী ও এক ছেলে। সারাদিনে কম করেও ২০০ মানুষ এখানকার হোটেলগুলিতে আসতেন।  ছুটির দিনগুলিতে অর্ডারের সংখ্যাটা হাজার পেরিয়ে যেত। এখন র‌্যাশন থেকে পাওয়া চালই ভরসা। একবেলা খেয়ে না খেয়ে ওই চালেই কোনওভাবে একের পর এক মাস কাটানোর চেষ্টা করছি। মোমো তৈরির বাসন ছেড়ে রংটং থেকে শিবখোলায় চলা রাস্তার কাজে শ্রমিকের কাজ পাওয়ার জন্য কাকুতিমিনতি করছিলেন রাকেশ কুজুর। তিনি বলেন, যা সঞ্চয় হয়েছিল, সেটা শেষ। সংসার চালানোর জন্য শ্রমিকের কাজের খোঁজে এলাম। কোনও কোনও সময়ে পর্যটকের দেখা পেলেও তাঁরা যে আর হোটেলে ঢুকছেন না। রাজেশদের মতন এমন আরও অনেকেই শ্রমিকের কাজের খোঁজে  আসায় তাঁদের কষ্টটা বুঝতে পারেন রাস্তার কাজের তদারকির দায়িত্বে থাকা সুশান্ত থাপা। তিনি বলেন, মাঝেমধ্যে বালি, পাথর আনার মতো কিছু কাজ দিলেও সবসময়ে যে কাজ দেওয়া যায় না। শুনসান রংটংকে দেখে সত্যি যেন মন কেমন করে। মন কেমন করলেও একদিন ফের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, সেই আশাতেই রয়েছেন অনুজ থাপা। টেবিল, চেয়ারগুলো পরিষ্কার করার মাঝেই বলে উঠলেন, একদিন সব ঠিক হবে, ফের রংটং মানুষের কোলাহলে গমগম করবে। সবাই আতঙ্কমুক্ত হয়ে ফের আমাদের হোটেলগুলিতে মোমো, চাউমিন খেতে আসবেন। সেই আশাতেই কোনওভাবে এই দিনগুলো পেরোনোর শক্তি জোগাচ্ছি।