বুক দিয়ে জঙ্গল আঁকড়ে সুরসূতি বনবস্তি

74

শুভদীপ শর্মা, লাটাগুড়ি : বয়সটা ৭০ পেরিয়েছে বেশ কিছুদিন আগেই। জীর্ণ শরীরটা আজ আর সেভাবে কাজ করতে পারে না মোটেই। তবে তাতে কী! লাটাগুড়ির জঙ্গলে ঘেরা সুরসূতি বনবস্তির বাবলু ওরাওঁ নিজের লাগানো ৫০০-রও বেশি গাছকে অবশ্য যে কোনও মূল্যে বাঁচাতে প্রস্তুত। একা বাবলুবাবুই শুধু নন, এই বস্তির প্রায় ৩৫ পরিবারের সমস্ত সদস্যই এভাবে জঙ্গল রক্ষায় সদা তৎপর। এই বনবস্তির প্রবীণ-নবীনদের হাত ধরেই নিশ্চিন্ত লাটাগুড়ির জঙ্গল। সুরসূতি বনবস্তির এই জঙ্গলপ্রেম নিশ্চিতভাবে আমাদের পৃথিবীটাকে আরও সবুজে রাঙানোর স্বপ্ন দেখাবে।

জঙ্গল থাকলে সবাই বাঁচবে। করোনা পরিস্থিতিতে বিষয়টি সাধারণ মানুষ ভালোভাবেই বুঝেছেন। খুব সাধারণ এই বিষয়টি জঙ্গলে ঘেরা সুরসূতি বনবস্তির প্রায় ৩৫ পরিবারের সদস্যরা অবশ্য অনেক আগেই বুঝেছিলেন। বন দপ্তর সূত্রে খবর, বছর পঞ্চাশেক আগে দপ্তরের তরফে লাটাগুড়ির জঙ্গলের বিভিন্ন স্থানে গাছ লাগানোর কাজ শুরু হয়। সুরসূতি বনবস্তির পুরুষদেরকেই একাজে লাগানো হয়েছিল। সামান্য অর্থের বিনিময়ে বনবস্তিবাসী বাবলু ওরাওঁ, চইতু ওরাওঁ, বিনসাই ওরাওঁরা  কয়েক দশক ধরে ফাঁকা জমিতে চারাগাছ লাগিয়ে এলাকাকে সবুজ করে তোলেন। গ্রামের বেশিরভাগ যুবকই আজকাল গরুমারার জঙ্গলে গাইডের কাজ করে সংসার চালান। তাঁরা জঙ্গলকে জীবন দিয়েছেন। জঙ্গল তাঁদের জীবন দিয়েছে।

- Advertisement -

তাই সুরসূতি জঙ্গল রক্ষার কাজে কোনও খামতি রাখতে চায় না। গ্রামের প্রত্যেকেই ১০০-রও বেশি চারা রোপণ করেছেন। শুধু  গাছ লাগানোই নয়, সেগুলোকে সযত্নে বড় করে তোলা এবং কাঠচোরেদের নজর থেকে বাঁচিয়ে রাখার কাজও করে বাবলুবাবুরা বছরের পর বছর ধরে করে চলেছেন। বড়দের দেখাদেখি ছোটরাও এই কাজে নিজেদের জীবন সঁপেছেন। বাবা-কাকাদের হাত ধরে চারাগাছ রোপণপর্ব আজও জারি রয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দা বাবলু ওরাওঁ, সোমরা ওরাওঁরা জানান। চোরাকারবারিরা আজ বিভিন্ন বনাঞ্চলে থাবা বসিয়েছে। কিন্তু সুরসূতি বনবস্তির প্রতিটি পরিবার যেভাবে সবুজকে বাঁচাতে জীবন সঁপেছেন তাতে লাটাগুড়ির জঙ্গল অনেকটাই নিশ্চিন্তে রয়েছে।

জঙ্গলের পাশাপাশি বন দপ্তরও সুরসূতির বাসিন্দাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। বন দপ্তরের লাটাগুড়ির রেঞ্জার শুভ্রশঙ্খ দত্ত বলছেন, জঙ্গল রক্ষায় এই বনবস্তির বাসিন্দারা যে দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন তা শিক্ষণীয়। তাঁদের দেখাদেখি অন্যরাও এভাবে এগিয়ে এলে জঙ্গলের সবুজ রং কোনওদিনই ফিকে হবে না।