শহর হলেও মেলে না পরিস্রুত জল, ভোটের আড্ডা ভোটঠাকুরে

82

বাণীব্রত চক্রবর্তী, ময়নাগুড়ি : গুটিকয়েক দোকান। এলাকার বুক চিরে চলে গিয়েছে পাকা রাস্তা। সেই রাস্তার দুধারে ঘন জনবসতি। এটা ময়নাগুড়ি শহরের ভোটঠাকুর মোড়, যার দূরত্ব শহর থেকে দুকিলোমিটার। ভোটঠাকুর মোড় ময়নাগুড়ি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার অন্তর্ভুক্ত। ভোটঠাকুর মোড়ের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য আড্ডা। এমনি সময়ে আড্ডায় বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক এবং গঠনমূলক আলোচনা চলে। তবে সামনে যেহেতু ভোট, তাই নাগরিক সমস্যাই আড্ডায় প্রাধান্য পাচ্ছে। এরমধ্যে সবার আগে রয়েছে পরিস্রুত পানীয় জলের সমস্যা। পাশাপাশি এলাকাবাসী নন্দীগ্রামের দিকেও নজর রেখেছেন।

এখানে জলের কেন সমস্যা, তার আগে জেনে নিই ভোটঠাকুর নাম হল কীভাবে? ব্রিটিশরা এই মোড়ে রাস্তার ধারে ছোট একটা টিনের চালাঘরে ঘোড়ার উপর এক যুবরাজের মূর্তি বসিয়েছিলেন। সেই থেকে মোড়ের নাম হয় ভোটঠাকুর। এই ঠাকুরকে মহিলারা নিত্যপুজো দেন। বা‌‌ৎসরিক একবার পুজো হয়। বাসিন্দারা শহরবাসী হলেও আগাগোড়াই পরিস্রুত পানীয় জল পরিষেবা থেকে বঞ্চিত। অনেক বাড়িতে কুয়োর জল শুকিয়ে গিয়েছে। ষাটোর্ধ্ব কামেশ্বর রায় বলেন, এলাকায় পরিস্রুত পানীয় জল পাওয়া যায় না। আমরা খুব সমস্যার মধ্যে রয়েছি। আরেক বাসিন্দা গৌতম রায় বলেন, জলের সমস্যায় এলাকার মানুষ পেটের রোগে ভুগছেন। কোনও বাড়ির কুয়োতে জল থাকলেও বেশ ঘোলা। আয়রনযুক্ত জল খাওয়া যায় না।

- Advertisement -

আর নন্দীগ্রামের প্রসঙ্গে বাসিন্দা ভূপেন রায় বলেন, এবারের আসল ভোট তো নন্দীগ্রামে। একদিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, আরেকদিকে শুভেন্দু অধিকারী। একবার নন্দীগ্রামে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। ঘুরে দেখেছি, ওখানে অধিকারী পরিবারের আলাদা একটা সুখ্যাতি রয়েছে।  জানি না, ভোটের বাক্সে এর প্রভাব কতখানি পড়বে। ভোটের মুখে এখানে পানীয় জল আর নন্দীগ্রাম ছাড়া যে আর কোনও আলোচনাই হয় না, তার প্রমাণ মিলল ফুলমালার কথায়। স্থানীয় বাসিন্দা ফুলমালা রায় ভোটঠাকুর মোড়ের মুদির দোকানে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে এসেছেন। ভোটের কথা বলতেই তিনি বেজায় চটে গিয়ে বললেন, যতবার এই মোড়ে আসি একই আলোচনা শুনতে পাই- পানীয় জল আর নন্দীগ্রাম। এছাড়া আর কিছু জানি না। জিনিসপত্রের যা দাম, তাতে আবার আলাদা করে ভোটের ভাবনা কী!

ব্যাংকান্দি স্কুলের সপ্তম শ্রেণির সুবীর দাস জানাল, মোড়ের নাম ভোটঠাকুর বলে এখানে ভোটের আলোচনা বেশি হয়। অন্যদের মতো সেও কিন্তু পরিস্রুত পানীয় জলের দাবি জানিয়েছে। এলাকার যুবক রুপম রায় জানালেন, এই মোড়ে এখনও সেভাবে বাজার জমেনি। অল্প কিছু দোকানপাট বসেছে। আসলে মোড়ের নামের সঙ্গে ভোটের একটা অসাধারণ সংমিশ্রণ রয়েছে। একটা আবেগ জড়িয়ে রয়েছে মানুষের। সেজন্য বোধহয় ভোটঠাকুর মোড়ের আড্ডায় বরাবরই শান্তিপূর্ণ ভোট তর্জা প্রাধান্য পেয়ে এসেছে। আর তাই সবাই কাজ সেরে চলে আসেন মোড়ে। সাবলীলভাবে চলে আলোচনা। এলাকার তৃণমূল কংগ্রেস নেতা এবং ব্যাংকান্দি শিশুশিক্ষাকেন্দ্রের পঞ্চায়েত সদস্য পরিতোষ রায় এলাকায় পানীয় জলের সমস্যার কথা মেনে নিয়েছেন। তিনি বলেন, ব্যাংকান্দিতে পানীয় জলপ্রকল্প নির্মাণের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। সেটা সফল হলে সমস্যা মিটবে।

ভোটঠাকুর মোড় হয়ে পাকা রাস্তা এলাকার বুক চিরে চলে গিয়েছে শহর থেকে আমগুড়ি হয়ে রামশাই। পাকা রাস্তার দুধারে সবুজ গালিচা পাতা চা বাগান। কৃষিজমি অনেকটাই দখল করে নিয়েছে চা বাগান। অনেক না পাওয়ার মধ্যেও ভোটঠাকুর মোড়ের আড্ডা বাড়তি অক্সিজেন জোগায়। ষাটোর্ধ্ব রিতা দেবনাথের কথায়, এখানে যা আলোচনা হয় তা সহজ-সরল এবং খুবই বাস্তব। এখানে টিভির পর্দা বা সভার মঞ্চের কথায় কিংবা আশ্বাসে মানুষ বিশ্বাসী নন। মানুষজন সবার মিটিং-সভায় যান। নিজেদের বিচার-বুদ্ধিতে ভরসা রেখে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেন।