রণবীর দেব অধিকারী, ইটাহার : রক্ষা পেল ইতিহাস। ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে গেল শতাব্দী প্রাচীন দেবালয়। সংস্কারের পর নতুন করে ভক্ত সমাগমে মুখরিত মারনাইয়ে প্রমথেশ্বর জিউর মন্দির।

ইটাহার থানার মারনাই অত্যন্ত প্রাচীন ও বর্ধিষ্ণু গ্রাম। পাথরে খোদাই করা একটি প্রামাণ্য নিদর্শন থেকে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে মারনাই, রাজকোট ও দিনাজপুর মিলে ছিল একটি স্টেট। মারনাইয়ে পত্তনিদার ছিলেন গ্রামেরই বাসিন্দা শশীভূষণ পাল চৌধুরী। ১৩২৬ বঙ্গাব্দে এই শশীভূষণ পাল চৌধুরীই গ্রামের ভক্তদের পুজোর জন্য প্রমথেশ্বর জিউর মন্দির গড়ে তুলেছিলেন। লোকের মুখে মুখে বর্তমানে যা শিবমন্দির বলে পরিচিত। উত্তর দিনাজপুরের প্রত্নতত্ত্ব গবেষক ডঃ বৃন্দাবন ঘোষ বলেন, নদিয়ার শান্তিপুর থেকে শিল্পী ও কারিগর এনে দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরের আদলে এই প্রমথেশ্বর মহাদেব জিউর মন্দির নির্মাণ করেন তৎকালীন মারনাইয়ে জমিদার শশীভূষণ পাল চৌধুরী।

- Advertisement -

দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ার ফলে মন্দিরটি ধ্বংস হতে বসেছিল। ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের খোঁজে ঘুরতে ঘুরতে একবার মারনাই গ্রামে গিয়ে প্রাচীন এই মন্দিরের জীর্ণ দশা দেখে আঁতকে ওঠেন ইতিহাস অণ্বেষক বৃন্দাবন ঘোষ। চোখের সামনে এভাবে ইতিহাসকে বিলুপ্ত হতে দিতে চাননি তিনি। মন্দিরটি বাঁচাতে ২০০৬ সাল থেকে লড়াই শুরু করেন বৃন্দাবনবাবু। এব্যাপারে বারবার হেরিটেজ কমিশনকে চিঠি লিখে আবেদন-নিবেদন করেন তিনি। অবশেষে হেরিটেজ কমিশন সাড়া দেয় তাঁর আবেদনে। মূলত তাঁরই লাগাতার নিরলস প্রচেষ্টায় রাজ্য হেরিটেজ কমিশন এই জীর্ণ মন্দিরকে তাদের তালিকাভুক্ত করে। ২০১৩ সালে মন্দিরটির সংস্কার ও নবরূপ দানের জন্য প্রথম পর্যায়ে হেরিটেজ কমিশনের মাধ্যমে ২৬ লক্ষ টাকা মঞ্জুর হয়। কিন্তু সেই টাকা দিয়ে সংস্কারের কাজ সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি। বেশ কিছুদিন থমকে থাকে সংস্কারের কাজ। এরপর ওই মন্দির সংস্কারের বাকি কাজ সম্পূর্ণ করার ব্যাপারে তৎপর হন ইটাহারের বিধায়ক অমল আচার্য। দ্বিতীয় পর্যায়ে বিধায়ক অমল আচার্যর তদবিরে সাড়ে ৭ লক্ষ টাকা মঞ্জুর হলে আবার কাজ শুরু হয়। সম্প্রতি সেই কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পর মন্দিরের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হল।

ইটাহারের বিধায়ক অমল আচার্য বলেন, মারনাইয়ে এই মন্দির এই অঞ্চলের প্রাচীন ঐতিহ্য বয়ে নিয়ে চলেছে। গ্রামবাসীদের দাবি মেনে এই ঐতিহ্যকে রক্ষা করার জন্য আমাদের সরকারের কাছে আর্জি জানিয়েছিলাম। সেই আর্জি মেনে হেরিটেজ কমিশনের দেওয়া সাড়ে ৭ লক্ষ টাকা দিয়ে সংস্কারের কাজ সম্পূর্ণ করা হল। চারপাশে আরও কিছু সৌন্দর্যায়নের কাজ বাকি আছে। আমি আমার বিধায়ক এলাকা উন্নয়ন তহবিল থেকে টাকা দিয়ে সেই বাকি কাজ শেষ করব।

নতুন রূপে মন্দিরকে পেয়ে খুশি মারনাই সহ আশপাশের গ্রামের শিবভক্ত থেকে শুরু করে আপামর সাধারণ মানুষ। শুক্রবার শিবচতুর্দশীর পুণ্যলগ্নে আপামর গ্রামবাসীর উপস্থিতিতে নবীকৃত মন্দিরের দ্বারোদ্ঘাটন করেন ইটাহারের বিধায়ক অমল আচার্য। অনুষ্ঠানে বিশিষ্টদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ইটাহারের বিডিও আবুল আলা মাবুদ আনসার, তৎকালীন জমিদারের বর্তমান প্রতিনিধি আশিস পাল চৌধুরী, জেলার ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব গবেষক ডঃ বৃন্দাবন ঘোষ, স্থানীয় প্রবীণ অক্ষয় পাল, লক্ষ্মণ পাল প্রমুখ।