কাগজে কলমে ভারি মেরিনার্সরা, আবেগে লাল-হলুদ

সুস্মিতা গঙ্গোপাধ্যায়, কলকাতা : একজন ভালো বন্ধু তোমার জীবনের সেরা গল্পগুলোর সবই জানে।

বন্ধুত্ব নাকি শত্রুতা? ১০০ বছরেরও বেশি পুরনো এই সম্পর্কটাকে ব্যাখ্যা করা কি এতই সহজ? তবে দুজনেরই বোধহয় একে অন্যের সব গল্প জানা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নাম, অবস্থান, বদলে বদলে গেলেও পরিচিতিটা তো সেই একই। তাই উত্তর কলকাতার সরু গলি থেকে আইএসএলের অভিজাত রাজপথ, সবেরই শোভা বর্ধন করতে দরকার সেই মোহন-ইস্টের চিরকালীন লড়াইকে। যাকে উৎসবের রূপ দিতে তৈরি থাকেন লাখ লাখ রঙিন সমর্থক। আবার সেই উৎসবের রঙে মেতে উঠতে তৈরি এবারের কোটিপতি লিগ। তবে আবহ কিছুটা আলাদা। কয়েক হাজার কিলোমিটার দূর থেকে নিজের নিজের দলকে নিয়ে মেতে উঠতে অবশ্য পাড়ায় পাড়ায় ইতিমধ্যেই তৈরি ঘটি আর বাঙালবাহিনী।

- Advertisement -

 

করোনার জেরে এবার আইএসএল শুধুমাত্র গোয়ায়। টুর্নামেন্টের উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে দিতে তাই আয়োজকরা মরশুমের শুরুতেই লড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পড়শিদের। তবে সেটা আদতে বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায় এফএসডিএলের কাছে। কারণ হঠাৎ আইএসএলের আসরে পৌঁছে যাওয়া বিব্রত এসসি ইস্টবেঙ্গল নিজেদের পায়ের নীচে জমিই খুঁজে পায়নি সেবার। এবার অবশ্যই পরিস্থিতি অন্য। সময়ে সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের তৈরি করে নিয়েছে রবি ফাওলারের দল। জানুয়ারির ট্রান্সফার উইন্ডোকে সঠিক অর্থেই কাজে লাগিয়েছে এসসি ইস্টবেঙ্গল। পয়েন্টের হিসাবে না হলেও এখন অনেকটাই গোছানো লাগছে তাদের দেখে। লিগও আর প্রথমবারের ভুলটা করেনি। দ্বিতীয় দফার শেষ পর্যায়ে জন্যই জিইয়ে রেখে দিয়েছে এদেশের সেরা ফুটবল উত্তেজনাকে। যদিও এসসি ইস্টবেঙ্গল প্লে অফের দৌড় থেকে ছিটকে গিয়েছে। কিন্তু প্রবলভাবে রয়েছে এটিকে মোহনবাগান।

আর সেইকারণেই দুতরফের কাছেই ম্যাচটার গুরুত্ব অপরিসীম। মেরিনার্সদের কাছে এই জয় যতটা সম্মানের ততটাই প্রয়োজনেরও। জিতলে শীর্ষস্থান ধরে রাখা সম্ভব। আর সেটা পারলে আগামী মরশুমে এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সরাসরি যোগ্যতার্জন করা সম্ভব। তার থেকেও বড়ো কথা, প্রথম দফার জয় ফিকে হয়ে যেতে পারে যদি এই ম্যাচটা রয় কৃষ্ণারা জিততে না পারেন। তৈরি না থাকা অবস্থায় তাদের হারানোর জন্য তখন তো দুয়ো শুনতেই হবে লাল-হলুদ সমর্থকদের কাছ থেকে।

সবথেকে বড়ো কথা, এই মুহুর্তে এটিকের সঙ্গ নিয়ে মোহনবাগানীদের হৃদয়ে ক্রমাগত রক্তক্ষরন হয়ে চলেছে। এই সম্মানরক্ষার ম্যাচে হারলে তো কথাই নেই, ড্র করলেও সেই কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে পড়বে। যা এই মুহূর্তে চাইছেন না এমনকি ভিক্টোরিয়া হাউসের কর্তারাও। আর যদি এবারও মেরিনার্সরা তরতর করে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন তাদের মোহনতরী, তাহলে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব আবার একবার প্রমান করতে কোনও অসুবিধাই হবে না। শক্তির বিচারে অবশ্য এখনও কাগজে-কলমে এগিয়ে আন্তোনিও লোপেজ হাবাসের দল। মাঝের একটা টালমাটাল অবস্থা কাটিয়ে ফের স্বমহিমায় সবুজ-মেরুন জার্সিধারীরা।

ডার্বির আগে টানা তিন ম্যাচে জয় নিঃন্দেহে নিজেদেরই উদ্দীপ্ত করার জন্য যথেষ্ট। রয় কৃষ্ণাকে নিয়ে যখন ইতিউতি প্রশ্ন ওঠা শুরু হয়েছে, তখনই তিনি ফের সিংহাসনে। এখনই ১৩ গোল করে এই মুহূর্তে গোল্ডেন বুটের এক নম্বর দাবিদার। একইভাবে লাস্ট লাইন অব ডিফেন্সে অরিন্দম ভট্টাচার্যও গোল্ডেন গ্লাভস পাওয়ার জন্য নিজেকে প্রতি ম্যাচে ছাপিয়ে যাচ্ছেন। তবে তিনি অবশ্য কৃষ্ণার মতো ততটা ভাগ্যবান নন। কারণ ফিজিয়ান যদি কোনওরকম আটকে যান তাহলে তাঁকে সংগত করতে একে একে এগিয়ে আসবেন মার্সেলিনহো লেইতে পেরেরা, মানবীর সিং, ডেভিড উইলিয়ামস, এমনকি জাভি হার্নান্ডেজ, লেনি রডরিগেজরাও। সবুজ-মেরুন কোচের কাছে বরং কাকে বসিয়ে কাকে খেলাবেন, এটাই বিড়ম্বনা।

অরিন্দমের বদলি সেভাবে হাতে নেই হাবাসের। কিছুটা চিন্তা রয়েছে ডিফেন্স নিয়ে। শুরুর নিশ্ছিদ্রভাবটা এখন অনেকটাই আলগা। তবু সন্দেশ-তিরি-প্রীতমরা আশা করাই যায়, এরকম একটা হাই ভোল্টেজ ম্যাচ নিজেদের অভিজ্ঞতা দিয়ে উতরে দিতে পারবেন। কলকাতা ডার্বি নিয়ে অভিজ্ঞতা আছে বলেই সম্ভবত হাবাসের মন্তব্য, ডার্বি একেবারেই অন্যরকম একটা ম্যাচ। এখানে নিজেদের মানসিকভাবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে হয়। যা অন্য ম্যাচের থেকে আলাদা। কারণ তোমাকে পরিস্থিতি অন্যভাবে সামাল দিতে হয়। বলতে পারেন সাংঘাতিক একটা ম্যাচ খেলতে নামব আমরা।

ঠিক এই জায়গাতেই হয়ত কিছুটা পিছিয়ে এসসি ইস্টবেঙ্গল। অভিজ্ঞতার দাড়িপাল্লায় তুললেই পিছিয়ে পড়ে লেসলি ক্লডিয়াস সরনীর ক্লাব। সৌজন্যে বিনিয়োগকারি সংস্থা। কারণ তাঁরাও নতুন এবং কিছু ক্ষেত্রে ক্লাবের অসহযোগীতায় হাত-পা বাঁধাও। তবু তারইমধ্যে যতটা সম্ভব নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও নানা গেরো যেন লেগেই আছে। রেফারিং নিয়ে লড়াই করতে করতে আপাতত মাঠের বাইরে স্বয়ং কোচই। তবে স্বস্তির কথা, ফুটবলারদের চোট-আঘাত, কার্ড সমস্যা কোনওটাই আর নেই। বরং এখন বেশ গোছানোই লাগছে দলটাকে। সুযোগ কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে এখনও কিছু সমস্যা রয়েছে। তবে ব্রাইট এনুবাখারেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছেন সমর্থকরা।

টনি গ্রান্টও তাই বলে দেন, ওদের অ্যাটাক লাইন সত্যিই ভালো। আমরা এদের সম্মান করছি। কিন্তু লড়াই থেকে সরছি না। রয়কে গুরুত্ব দিতেই হবে, কারণ সারা মরশুম ধরে ও নিজেকে প্রমান করে চলেছে। তবে এটিকে মোনবাগানকে আমরা ভয় পাচ্ছি না। এই ভয় না পাওয়া, হার না মানা মনোভাবই হল বাঙালদের চিরকালীন ট্রেডমার্ক। এমনিতেই ডার্বি নিয়ে আগাম পূর্বাভাস দেওয়া নাকি মুর্খামি। ইতিহাস বলছে, এরকম ম্যাচে পিছিয়ে দলই বহুবার বাজিমাৎ করেছে। শুক্র সন্ধ্যায় এমন কোনও কিছুর সাক্ষী ভারতীয় ফুটবল হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।