হোমে গেল একরত্তি রিধি, মন ভার নার্সদের 

189

বীরপাড়া: মৃত্যুদূত হয়ে ওঠা করোনা নামক ভাইরাসের রক্তচক্ষুর মাঝে হাসপাতালে ডিউটি করতে করতে এক সময় হাঁপিয়ে উঠছিলেন ওঁনারা। কিন্তু হঠাৎ করেই সদ্যোজাত শিশুটি যেন হয়ে উঠেছিল ওঁনাদের নয়নের মনি। চনমনিয়ে ওঠেন নার্সরা। ওকে বাঁচিয়ে রাখতেই হবে। এ যেন ছিল আরেকটা চ্যালেঞ্জ। ফুটফুটে শিশুকণ্যাটির মা মানসিক ভারসাম্যহীন। মা থেকেও যেন নেই। তাই ওর যত্নআত্তিতে নার্সরাই হয়ে উঠেছিলেন এক একজন মা। এদিকে তাঁর মানসিক ভারসাম্যহীন জন্মদাত্রী মা স্তনপান করাতেও রাজি নয় মেয়েকে। এই পরিস্থিতিতে অন্য সদ্য প্রসবারাও এগিয়ে আসেন। সব মিলিয়ে করোনা আবহেও বীরপাড়া রাজ্য সাধারণ হাসপাতালের এসএনসি ইউনিটটি রূপ নেয় এক্কেবারে বাড়ির মতোই। এ যেন ঘরে নতুন সদস্যের আবির্ভূত হওয়া।

২৬ মে জন্ম নেয় শিশুকণ্যাটি। গত ১২-১৩ দিন ধরে শিশুটিই যেন ছিল নার্সদের ধ্যান জ্ঞান। হঠাৎ করে তাঁকে কি আর অন্য কারও হাতে তুলে দিতে মন চায়? কিন্তু আইন তো অন্য কথা বলে। তাই শিশুটিকে মঙ্গলবার তুলে দিতে হল চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটি ও চাইল্ড লাইনের প্রতিনিধিদের হাতে। হাসপাতালের দুধ-মা, নার্স-মায়েদের মায়া কাটিয়ে মেয়ে গেল কোচবিহারের হোমে।

- Advertisement -

ফুটফুটে ওই শিশুকণ্যাটির মায়ের পরিচয় এখনও অধরা। ডিমডিমা চা বাগানের হাটখোলায় রাস্তার পাশে পড়ে ছটফট করছিল অন্তঃসত্বা তরুণীটি। তাঁকে ভরতি করানো হয় বীরপাড়া রাজ্য সাধারণ হাসপাতালে। একটি শিশুকন্যার জন্ম দিয়েও কিন্তু মেয়ের দিকে ফিরে তাকাতে রাজি নয় সে। তাই এসএনসি ইউনিটের ১১ জন নার্সের এক একজন হয়ে ওঠেন তাঁর মা। ওর নীলচে চোখের নিষ্পাপ চাউনির মায়া কাটাতে পারেননি নার্সদের কেউই। সহকারী সুপার বিপুল বোসের কথায়, ‘শিশুটি খুব অ্যাকটিভ। চোখে চোখে তাকিয়ে থাকে।’ মঙ্গলবার মেয়ের বিদায়বেলায় ওঁনারা কিনে দেন নতুন জামা। মেয়ে একটা নিশ্চিত আশ্রয়ে যাচ্ছে জেনেও এদিন যেন চোখ ছলছল করছিল পিংকী পাল, গীতা  মুন্সী, জ্যোৎস্না মণ্ডল সহ বাকিেদরও। উপস্থিত ছিলেন সহকারী সুপার বিপুল বোস। এদিন শিশুটির নাম রাখা হয় রিধি।

বীরপাড়া চাইল্ড লাইনের টিম লিডার রিয়া ছেত্রী বলেন, ‘শিশুটি এখন থেকে কোচবিহারের একটি হোমে থাকবে। হাসপাতালের নার্সরা এই ক’টা দিন ওকে মাতৃস্নেহে আগলে রেখেছিলেন। মঙ্গলবার বিদায় লগ্নে শিশুটিকে উপহার সামগ্রীও দিয়েছেন তাঁরা। এতেই তাদের নিষ্ঠার পরিচয় পাওয়া যায়।’ সহকারী সুপার বিপুলবাবু বলেন, ‘আসলে এই ক’টা দিনে বাচ্চাটি সবার আপন হয়ে উঠেছিল। তাই আজ নার্সদের মন ভার হয়ে ওঠে। শিশুটির মা হাসপাতালেই রয়েছেন। তাঁর ব্যাপারে যাবতীয় তথ্য জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রশাসনের নির্দেশ পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে।’

এসএনসি ইউনিটের ছোট্ট বেডটা এখন ফাঁকা। যদিও নার্সদের মুখে এখনও ওর কথাই, ‘হঠাৎ করেই পাগলি মায়ের মেয়েটা এসে মায়ার জালে জড়িয়ে গেল!’