তুষার দেব, দেওয়ানহাট : বনেজঙ্গলে ছবি তুলে বেড়ানোই তাঁর নেশা। তাঁর ক্যামেরার লেন্সে ধরা পড়েছে মাকড়সা থেকে ইন্ডিয়ান ক্যাবেজ হোয়াইট প্রজাপতিরা, ডেনড্রোবিয়াম অর্কিড থেকে চিকরাশি গাছের সারি। সেই জঙ্গলের ছবি কোচবিহারের রিপন বিশ্বাসকে আবার আন্তর্জাতিক সম্মান এনে দিল। ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম অফ লন্ডনের বিচারে তিনি ওয়াইল্ড লাইফ ফোটোগ্রাফার অফ দ্য ইয়ার সম্মান পেলেন। মঙ্গলবার রাতে লন্ডনে জমকালো অনুষ্ঠানে তারা রিপনবাবুর হাতে এই পুরস্কার তুলে দিয়েছে। অস্কার অফ দ্য ওয়াইল্ড লাইফ ফোটোগ্রাফি নামে গোটা বিশ্বে পরিচিত এই সম্মান পাওয়ায় রিপনবাবুকে কুর্নিশ জানাচ্ছেন সকলেই। তাঁর সাফল্যে পরিবারের লোকজন সহ প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব ও শুভানুধ্যায়ীরা রীতিমতো উৎসবে মেতেছেন। লন্ডন থেকে রিপনবাবুও জানিয়েছেন, পুরস্কার পাওয়ার সময়টা তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত।

কোচবিহার-১ ব্লকের ধলুয়াবাড়ি এলাকার বাসিন্দা বছর পঁয়ত্রিশের রিপনবাবু পেশায় বলরামপুর হাইস্কুলের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। ফোটোগ্রাফি তাঁর নেশা। এক যুগ ধরে সুযোগ পেলেই ছবি তোলার টানে বনেজঙ্গলে ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি। তাঁর বিচরণক্ষেত্রের মধ্যে সবার আগে আসে বক্সার জঙ্গল। জীববৈচিত্র‌্যের দিক থেকে দুনিয়ার সবচেয়ে স্বীকৃত জায়গাগুলির অন্যতম বক্সা তাঁকে বারবার টেনেছে।

- Advertisement -

ফি-বছর ন্যাশনাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম অফ লন্ডন ১৮টি ক্যাটিগোরিতে ওয়াইল্ড লাইফ ফোটোগ্রাফারদের পুরস্কৃত করে। এই পুরস্কারের জন্য রিপনবাবু প্রায় দশ মাস আগে অ্যানিমাল পোর্ট্রেট ক্যাটিগোরিতে বক্সা টাইগার রিজার্ভ ফরেস্টে তোলা একটি পিঁপড়ে-মাকড়সার ছবি পাঠান, যার বৈজ্ঞানিক নাম অ্যান্ট মিমিকিং স্পাইডার। এই ছবিটিই সংশ্লিষ্ট ক্যাটিগোরিতে তাঁকে শিরোপা এনে দিয়েছে। আয়োজকদের তরফে আমন্ত্রণ পেয়ে গত সোমবার কলকাতা থেকে লন্ডনে পাড়ি দেন রিপনবাবু। বুধবার সেখান থেকেই ফোনে তিনি জানান, মঙ্গলবার রাতের অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে শংসাপত্র, পোর্টফোলিও বুক, লক্ষাধিক টাকার আর্থিক পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। শুক্রবার কোচবিহারে ফিরবেন তিনি। তাঁর যাতায়াত সহ সমস্ত খরচ বহন করছেন উদ্যোক্তারাই।

ম্যাক্রো ফোটোগ্রাফিতে এর আগেও রিপনবাবু দেশকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সম্মান এনে দিয়েছেন। ২০১৬ সালে স্যাংচুয়ারি এশিয়া, ক্যামারেনা অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড, ২০১৭ সালে ইনটারন্যাশনাল গার্ডেন ফোটোগ্রাফার অফ দ্য ইয়ার (ফাইনালিস্ট) সম্মান পান। ওই বছরেই তাঁর ছবি আমেরিকা থেকে ওয়াইল্ড লাইফ ফোটো অফ দ্য ইয়ার পুরস্কার পায়। দেশেও বহু পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। লন্ডনে পাওয়া পুরস্কারের পিছনে তিনি পরিবারের বিশেষ ভূমিকার পাশাপাশি বন্ধুবান্ধব, স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও সহকর্মীদের সহযোগিতার কথা জানান। তিনি বলেন, এত বড়ো সাফল্য পেয়ে আমি আপ্লুত, উচ্ছ্বসিত। আমি চাই এর মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের অরণ্যসম্পদের প্রতি সাধারণ মানুষ ও বন দপ্তরের উৎসাহ বৃদ্ধি পাক। বন্যপ্রাণ সংরক্ষণে গুরুত্ব বাড়ুক। উত্তরবঙ্গের প্রাকৃতিক সম্পদকে কেন্দ্র করে সহজেই বিশ্বজয় সম্ভব বলে আমি মনে করি।

স্বামীর এই সাফল্যে স্ত্রী শুক্লাদেবী ও পরিবারের সদস্যরা সকলেই উচ্ছ্বসিত। শুক্লাদেবী বলেন, ও আরও অনেক সাফল্য পাবে বলে আমরা নিশ্চিত। ওর ফেরার অপেক্ষায় আছি। বিশ্বমঞ্চে সাফল্যের পর ও বাড়িতে এলে সবাই মিলে সারপ্রাইজ দেব।