ফালাকাটা, ২৪  জুলাই : বর্ষায় ছোটো-বড়ো সব নদী আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায় মানুষের কাছে। পাড় এলাকায় বসবাসকারীদের তো নদীর গর্জনে রাতের ঘুম উড়ে যায়। কোথাও বাঁধ ভাঙতে শুরু করলে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে পঞ্চায়েত-প্রশাসনের। অথচ ফালাকাটা ও আলিপুরদুয়ার ১ ব্লকের মধ্যে থাকা জলদাপাড়া বনাঞ্চলের আশপাশ দিয়ে প্রবাহিত পাঁচটি নদী এই ভরা বর্ষায় কিছু মানুষের কাছে উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। দোলং, চরতোর্ষা, বুড়ি তোর্ষা, সনজয় আর শিলতোর্ষা নদীতে কখন জল বাড়ল, নদীতে আস্ত গাছ বা গাছের গুঁড়ি ভেসে এল কিনা সেদিকেই তাকিয়ে থাকেন স্থানীয় কিছু বাসিন্দা। ভরা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ভেসে আসা গাছ বা গুঁড়ি সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করেই এই সময়ে তাদের ভালো উপার্জন হয়। বছরের অন্য সময় সাধারণ খেতমজুরের কাজ করা এই গরিব মানুষগুলো তাই  বৃষ্টি বেশি হোক, নদীতে জল বাড়ুক– এই অপেক্ষায় থাকেন বর্ষার ক’দিন।

ফালাকাটা ব্লকের উপর দিয়ে বয়ে গিয়েছে দোলং, চরতোর্ষা ও বুড়ি তোর্ষা নদী। সনজয় ও শিলতোর্ষা নদী বয়ে গিয়েছে আলিপুরদুয়ার ১ ব্লকের উপর দিয়ে। দুই ব্লকের উত্তর দিকে রয়েছে জলদাপাড়া বনাঞ্চল। শিলতোর্ষা, চরতোর্ষা, সনজয় নদীতে সারা বছর জল থাকলেও বুড়িতোর্ষা ও দোলং নদীতে খরার মরশুমে সেরকম জল থাকে না। কিন্তু বর্ষায় পাঁচটি নদীই ফুলেফেপে ওঠে। চরতোর্ষা নদীর জল বেড়ে যাওয়ায় পরপর জাতীয় সড়কের ডাইভারশন ভেঙে গিয়েছে।  সনজয় ও দোলং নদীর কোথাও বাঁধের ভাঙন শুরু হয়েছে। এসব নিয়ে আতঙ্কের শেষ নেই বহু মানুষের। তবে এরমধ্যেও জল বেড়ে নদীতে কোনো ‘রসদ’ ভেসে এল কিনা সেই অপেক্ষায় রয়েছেন নদী সংলগ্ন এলাকার কিছু বাসিন্দা। জলদাপাড়া বনাঞ্চলে পাড় ভাঙনের জেরে  প্রতিটি নদীতেই এইসময় ভেসে আসা গাছের সংখ্যা নেহাত কম নয়।

চরতোর্ষা পাড়ের বাসিন্দা রমেশ তালুকদার বলেন, ‘৩-৪ জন মিলে একটা গাছ ধরতে পারলেই কয়েক হাজার টাকা উপার্জন হয়।  বৃষ্টি একটু বেশি হলেই উজান থেকে প্রায়ই গাছ ভেসে আসে।’ বুড়িতোর্ষা পাড়ের বাসিন্দা সঞ্জয় দাস ও প্রীতম দাসরা জানান, এভাবে নদীতে নেমে গাছ ধরাটা বর্ষাকালে অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। সব থেকে বেশি গাছ ও গাছের গুড়ি ভেসে আসে শিলতোর্ষায়। এই নদীতে স্রোতও অনেক বেশি। এখানে প্রচুর বালি-পাথরের রিভার বেড থাকায় স্থানীয়দের  অনেকেরই নৌকা রয়েছে।  নদীতে গাছ ধরার ক্ষেত্রে সেই নৌকাকে কাজে লাগান স্থানীয়রা। নদীতীরের বাসিন্দা মঞ্জুর আলম বলেন,  ‘এই কাজ কারো একার পক্ষে সম্ভব নয়। কয়েক জনের মিলিত চেষ্টায় গাছ বা  গুঁড়ি নৌকার সাহায্যে ধরা হয়। তারপর সেগুলি বিক্রি করে ভালোই উপার্জন হয়।’

ভরা নদীর বুকে বিপজ্জনকভাবে এই কাজ চললেও প্রশাসনের কিছুই করার থাকে না। ফালাকাটা-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের উপ প্রধান চঞ্চল অধিকারী বলেন, ‘কেউ কেউ এভাবে নদীতে নেমে গাছ ধরে, এটা ঠিক। কিন্তু কাজটা খুবই বিপজ্জনক। যেকোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে।’  আলিপুরদুয়ার ১ পঞ্চায়েত সমিতির বনভূমি কর্মাধ্যক্ষ পীযুষ কান্তি রায় বলেন, ‘কিছু অর্থের লোভে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে এভাবে নদীতে নেমে গাছ ধরাটা মোটেই ঠিক নয়।’

ছবি: চরতোর্ষা নদীতে ভেসে আসা গাছ কেটে নিচ্ছেন বাসিন্দারা। – সুভাষ বর্মন