কল্লোল মজুমদার, মালদা : মণ্ডপ শিল্পী একদিন আগেই বাঁশের কাঠামো তৈরি করেছিলেন। মণ্ডপের মাথায় পড়েছিল ত্রিপল। মৃৎশিল্পীর বাড়ি থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল প্রতিমা। কথা ছিল শেষ কাজ মণ্ডপেই সারবেন তিনি। কিন্তু রবিবার সকালে উঠে দেখা গেল, গঙ্গার জল প্রবেশ করেছে মণ্ডপে। প্রতিমার চরণ ছুঁই ছুঁই জল। পুজোর মাত্র কয়েকদিন আগেই গঙ্গার এই তাণ্ডবে দিশেহারা কালিয়াচক-৩ ব্লকের পারলালপুর। এই এলাকায় দুর্গোপুজো করে স্পোর্টস ক্লাব। সব আয়োজন শেষ হলেও পুজো শেষ পর্যন্ত হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। পুজোর আগেই মা দশভুজার মাটির মূর্তি গঙ্গার জলে ডুবে যাবে কিনা, তা নিয়ে সন্ধিহান এলাকার মানুষ।

মালদা জেলায় ৩ নদীর দাপট ক্রমশ বেড়েই চলেছে। বেড়ে চলেছে জলস্তর। একের পর এক গ্রাম গ্রাস করছে ফুলহর, গঙ্গা, মহানন্দা নদীর জল। উৎসবের মুখে একে একে গৃহহীন হয়ে পড়েছেন লাখো মানুষ। সব মিলিয়ে বাড়ছে উৎকণ্ঠা। ৩ নদীর জলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে অবিরাম বর্ষণ। জেলার সেচদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ প্রায় ৬৫ মিলিমিটার। একই সঙ্গে জানা গিয়েছে, এদিন গঙ্গার জলস্তর পৌঁছে যায় ২৫.৮৩ মিটারে। যা বিপদসীমার চাইতে ৫০ সেন্টিমিটারের বেশি। ফুলহর নদীর উচ্চতা পৌঁছে গিয়েছে ২৭.৭০ মিটারে। যা অতিক্রম করেছে বিপদসীমা। পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মহানন্দার জলও। এদিন মহানন্দার জলস্তর ছিল ২০.২৪ মিটার। এই নদী নিয়ে এই মুহূর্তে আশঙ্কা তেমন না থাকলেও তীরবর্তী বাসিন্দারা ইতিমধ্যে জলবন্দি হয়ে পড়েছেন।

- Advertisement -

সেচদপ্তর সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, আগামী ৭২ ঘণ্টা ৩ নদীর জলস্তর আরও বৃদ্ধি পাবে। কারণ, উত্তরপ্রদেশ এবং বিহারে ভারী বর্ষণের জেরে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে গঙ্গার জলে। যে জল নেমে আসছে মালদার দিকে। ফলে এই মুহূর্তে পুজোয় কোনো আশার আলো দেখাতে পারছেন না সেচকর্তারা। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে রাজ্যকে ভারী বৃষ্টি নিয়ে সতর্ক করা হয়ছে। যে তালিকায় প্রথম ৩ স্থানে রয়েছে মালদা সহ দুই দিনাজপুর। এই ৩ জেলায় ভারী বৃষ্টি নিয়ে লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

এদিকে, গঙ্গার জল বেড়ে চলায় কালিয়াচক-৩ ব্লকের পারদেওনাপুর, পারলালপুরের একের পর এক গ্রাম চলে যাচ্ছে জলের তলায়। এলাকার বাসিন্দা মণিরুল ইসলাম, গোপাল মণ্ডল, শ্রীহরি সন্ন্যাসীরা জানিয়েছেন, এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি যেতে লাগছে নৌকা। পুরো এলাকাটাই টুকরো টুকরো দ্বীপে পরিণত হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। তার ওপর জলের তোড়ে একের পর এক ইলেকট্রিক পোল চলে যাচ্ছে নদী গর্ভে। যা থেকে বিপদ হতে পারে। তাই সমস্যা সমাধানে এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুতের অভাবে মোবাইল চার্জ দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে অন্যান্য জায়গার সঙ্গে দূরাভাষেও যোগাযোগ বন্ধ হয়েছে পুরোপুরি।

আগামী আরও দু-একদিন এইরকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ চললে পরিস্থিতি হবে আরও ভযংকর।অভিযোগ উঠেছে এই এলাকার প্রায় ৫০ হাজার মানুষ বানভাসির কবলে পড়েছেন। কোনো কোনো পরিবার দু-একটি ত্রিপল, পলিথিন পেলেও অধিকাংশের মেলেনি সরকারি ত্রাণ। কালিয়াচক-৩ ব্লক কার্যত থেকে যাচ্ছে পুরোপুরি অন্ধকারে। না জেলা প্রশাসন, না ব্লক প্রশাসন কেউ-ই ঘুরেও তাকাচ্ছে না পারলালপুরের দিকে।