কাটমানি না মেলায় রাস্তার কাজ বন্ধ

শেখ পান্না, রতুয়া : মালদা জেলার রতুয়া-১ ব্লকের ধোবি মোড় থেকে শিবপুর ঘাট পর্যন্ত প্রায় ৫ কিমি রাস্তা সংস্কার না হওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছেন এলাকার মানুষ। বহুদিন ধরে এই রাস্তাটি বেহাল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এলাকাবাসীর বহু আন্দোলনের পর অবশেষে শুরু হয়েছিল রাস্তা সংস্কারের কাজ। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জেলা পরিষদের রুলার ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের ৩ কোটি ৩১ লক্ষ ৫০ হাজার ১১৯ টাকা বরাদ্দে প্রায় ৫ কিমি রাস্তা সংস্কারের কাজ শুরু করে এক ঠিকাদার সংস্থা। রাস্তা সংস্কারের কাজ শুরু হতেই আনন্দিত হয়েছিলেন এলাকাবাসী। কিন্তু তাঁদের আনন্দ বেশিদিন স্থাযী হয়নি। শাসকদলের নেতাদের কাটমানির দাবি সামলাতে না পেরে রাস্তার কাজ ছেড়ে চলে যায় ঠিকাদার সংস্থা।

এই অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। যদিও কাটমানি ইস্যুকে বিজেপির তৈরি রাজনৈতিক রং বলে দাবি করেছেন স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্ব। তবে আগামী বিধানসভা ভোটের আগে কাহালা এলাকায় এই রাস্তা যে ভোটে অন্যতম ইস্যু হতে চলেছে তা বলাই বাহুল্য। কাহালার বাসিন্দা মনোজ্যোতি মিশ্র অভিযোগ করেন, শুধু কাহালা নয়, এই রাস্তা দিয়ে রতুয়া ও মানিকচকের অনেক মানুষ যাতায়াত করেন। ২০০১ সালে শেষবার এই রাস্তার কাজ হয়েছিল। ২০০৬ সালে রাস্তাটা ফের খারাপ হয়ে যায়। তারপর থেকে আর সংস্কার হয়নি। শেষ পর্যন্ত প্রায় আড়াই বছর আগে রাস্তা সংস্কারের কাজ শুরু হয়। কেন সেই কাজ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল তা সঠিক বলতে পারছিনা। তবে আমাদের মনে হয় চারিদিকে শাসকদলের নেতাদের যেভাবে কাটমানির দৌরাত্ম্য চলছে তার জেরেই এই রাস্তার কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আমরা চাই রাস্তার কাজ দ্রুত শেষ হোক।

- Advertisement -

একই বক্তব্য আরেক বাসিন্দা নারায়ণ মিশ্রের। তিনি বলেন, এই রাস্তা সংস্কারের দাবিতে এলাকার মানুষের সঙ্গে আমিও চার ঘণ্টার ওপর বিডিও অফিস ঘেরাও করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত রাস্তার কাজ শুরু হয়। কিন্তু কিছুদিন পর ঠিকাদার সংস্থা কাজ ছেড়ে পালিয়ে যায়। তবে কেন ঠিকাদার কাজ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছে সেটা শাসকদলের নেতারাই বলতে পারবে। এই ঘটনার সঙ্গে এখানকার নেতাদের যোগসাজশ নেই তো! এখন তো কাটমানি ছাড়া কোনও কাজ হয় না। সব জায়গায় কাটমানি আর কাটমানি। অপর এক বাসিন্দা সঞ্জয় সিংহ বলেন, কাহালা রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ। কেন যে এই দুরবস্থা তা বুঝে উঠতে পারছি না। তিন বছর আগে রাস্তার টেন্ডার হয়েছে এবং কাজও শুরু হয়েছিল। কিন্তু মাঝ রাস্তায় কাজ আটকে পড়েছে। রাস্তার কাজ যখন শুরু হয়েছিল আমরা এলাকাবাসী খুব আনন্দিত হয়েছিলাম। প্রশাসনের কাছে আমাদের অনুরোধ খুব শীঘ্রই যেন রাস্তার কাজ শেষ করা হয়।

বিজেপির মণ্ডল কমিটির সভাপতি সুকান্ত সিংহ বলেন, কাহালা গ্রাম পঞ্চায়েতের ধোবি মোড় থেকে শিবপুর ঘাট পর্যন্ত প্রায় ৫ কিমি রাস্তা দীর্ঘদিন ধরেই বেহাল। এই রাস্তার উপর নির্ভর করে পাঁচটি গ্রাম পঞ্চায়েতের মানুষ। মানিকচকের উত্তর ও দক্ষিণ চন্ডীপুর, বিলাইমারি, হীরানন্দপুর, কাহালা সহ আশেপাশের প্রায় কয়েক হাজার মানুষ এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করেন। এই রাস্তার ধারে রয়েছে দশ থেকে বারোটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুটি হাইস্কুল এবং একটি জুনিয়ার হাইস্কুল সহ কিছু সরকারি দপ্তর। রাস্তার কাজ শুরু হওয়ার পর শাসকদলের নেতাদের কাটমানির অত্যাচারে ঠিকাদার সংস্থা কাজ ছেড়ে চলে যায়। ২০১৯ সালে এই রাস্তার কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। ২০২০ সাল শেষ হতে চলেছে। রাস্তার কাজ কবে শেষ হবে তা জানি না। এলাকার স্থানীয় শাসকদলের নেতাদের কাটমানির অত্যাচারে ঠিকাদার সংস্থা কাজ ছেড়ে পালিয়েছে। এ বিষয়ে রতুয়া-১ ব্লকের বিডিও, জেলা শাসক সহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ জানিয়েছি। তবুও কোন কাজ হয়নি।

এই প্রসঙ্গে সিপিএমে জেলা কমিটির সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য সুশান্ত সিংহ বলেন, দীর্ঘ টালবাহানার পর প্রায় দুবছর আগে রাস্তা সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছিল। কিন্তু তারপর সব বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ঠিকাদার সংস্থা ও বিভাগীয় লোকজন এলাকায় আসেননি। এই রাস্তার কাজ যেন দ্রুত করা হয় এই বিষয়ে আমরা বিডিওকে ডেপুটেশন দিয়েছি। রাস্তার কাজ বন্ধ থাকায় আবার ভাঙতে শুরু করেছে। রাস্তার মাঝেসাজে খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। দ্রুত কাজ শুরু না হলে রাস্তা ফের আগের অবস্থায় চলে যাবে। আমরা চাই রাস্তার কাজ যেন দ্রুত শেষ করা হয়। এই বিষয়ে স্থানীয় তৃণমূল নেতা তথা রতুয়া-১ ব্লকের সাধারণ সম্পাদক রাজেশ সিংহ জানান, এই রাস্তা সংস্কারের জন্য আমরা বাম আমল থেকেই দাবি জানিয়ে আসছিলাম। কিন্তু বাম আমলে সেই কাজ হয়নি। রাজ্যে ক্ষমতায় এসে মানবিক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই রাস্তা সংস্কারের দাবি অনুমোদন করেন। দুবছর আগে কাজ শুরু হয়েছে। কাজ ভালোই চলছিল।

তাঁর দাবি, তবে বিগত বছর বন্যায় কাহালা অঞ্চল প্লাবিত হয়েছিল। এরপর বন্যার জল শুকোতে প্রায় কয়েক মাস লাগে। রাস্তার বেশ কিছু জায়গায় ক্ষয়ক্ষতি হয়। ওই রাস্তা দিয়ে নির্মাণসামগ্রী নিয়ে যাওয়া যাচ্ছিল না। তাই ঠিকাদার সংস্থা বাধ্য হয়ে কাজ বন্ধ রেখেছে। তবে এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে দ্রুত কাজ শুরু হবে। বিরোধীরা এটিকে কাটমানি ইস্যু করছে। তৃণমূলে কেউ কাটমানি খায় না। বিরোধীরা রাজনৈতিক রং লাগানোর চেষ্টা করছে। তাদের এই প্রয়াস কোনওদিন সফল হবে না। আমাদের মানবিক মুখ্যমন্ত্রী উন্নয়নের প্রতীক। এই উন্নয়নকে কেউ রাজনৈতিক রং লাগিয়ে থামাতে পারবে না।