কাটমানির চাপে তিন বছরেও অসমাপ্ত রাস্তা

মোস্তাক মোরশেদ হোসেন, রাঙ্গালিবাজনা : নেতাদের কাটমানির চাপ ও স্থানীয় তোলাবাজদের দাপটে তিন বছরেও আলিপুরদুয়ার জেলার শিশুবাড়ি থেকে দলমোর চা বাগান পর্যন্ত পাকা রাস্তার কাজ সম্পূর্ণ হল না। রাজনৈতিক দলের নেতাদের কাটমানি, ক্লাবের চাঁদা, এমনকি চিকিৎসার টাকা পর্যন্ত দেওয়া সত্ত্বেও আবদার শেষ হয়নি বলে অভিযোগ। প্রতিষ্ঠিত নেতাদের পর এলাকার পুঁচকে নেতারা উৎপাত শুরু করেন বলে অভিযোগ বরাতপ্রাপ্ত ঠিকাদারের। তিতিবিরক্ত ঠিকাদার অবশেষে কাজের দায়িত্ব থেকে হাত তুলে নেন। পরে কাজ যায় অন্য দুই উপঠিকাদারের হাতে। কিন্তু পুজোর আগে কাজের শাটারিং ভেঙে তাঁদের তাড়িয়ে দেয় টাকার দাবিদাররা। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনকেও তাঁরা পাশে পাননি বলে অভিযোগ ঠিকাদারের। বৃহস্পতিবার সংবাদমাধ্যম ওই এলাকায় গিয়ে খোঁজখবর শুরু করার পর শুক্রবার ফের গোপালপুরে আর্থমুভার নিয়ে যান ঠিকাদার। তবে কাজ কতটা করতে পারবেন তা নিয়ে সন্দিহান তাঁরা। এদিকে, দীর্ঘদিন আগে কাজ শুরু হলেও আজ পর্যন্ত রাস্তার বেশিরভাগ অংশে পিচের প্রলেপ না পড়ায় ক্ষোভ বাড়ছে এলাকায়। বিষয়টি নিয়ে অবশ্য খোঁজখবর নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন আলিপুরদুয়ার জেলা পরিষদের সভাধিপতি শীলা দাস সরকার।

আলিপুরদুয়ার জেলা পরিষদ সূত্রের খবর, বাংলার গ্রামীণ সড়ক যোজনা প্রকল্পে (প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা) মাদারিহাট-বীরপাড়া ব্লকের শিশুবাড়ি চৌপথি থেকে গোপালপুর চা বাগানের ভেতর দিয়ে দলমোর চা বাগানের লঙ্কাপাড়া-বীরপাড়া রোড সংযোগকারী প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তাটি পুনর্নির্মাণের জন্য সাড়ে তিন কোটিরও বেশি টাকা মঞ্জুর করা হয়। নির্মাণের পর পাঁচ বছরে ওই রাস্তা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মঞ্জুর হয়েছে তিরিশ লক্ষ টাকা। ২০১৭ সালের ১৫ জুন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভার্চুয়ালি রাস্তাটির কাজের সূচনা করেন। কিন্তু কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের মার্চ মাসে। তবে কাজ শুরুর দিন দশেক পরই তোলাবাজদের দৌরাত্ম্যে তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে যেতে হয় ঠিকাদারের লোকজনকে। বিষয়টি তখন উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত হলে ওপরমহলের হস্তক্ষেপে কাজ শুরু হয়। কিন্তু এরপরও বারবার টাকার জন্য চাপ আসছিল। ফলে বারবার কাজ বন্ধ হচ্ছিল। বাধ্য হয়ে একসময় কাজের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান বরাতপ্রাপ্ত ঠিকাদার সংস্থা। সংস্থার অংশীদার আবদুল আলিম বলেন, টাকার জন্য এত চাপের মুখে আর কোথাও পড়িনি। সবকিছু বলাও সম্ভব নয়। আমাকে এলাকায় কাজ তো করতে হবে।

- Advertisement -

পরে কাজের দায়িত্ব পাওয়া বাকি দুই ঠিকাদারকেও টাকার জন্য চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ। এদের মধ্যে বিশ্বজিৎ মোহন্ত বলেন, গোপালপুর চা বাগানে কালভার্ট তৈরির জন্য দুর্গাপুজোর আগে শাটারিং লাগানো হয়। কিন্তু এলাকার বেশ কিছু লোকজন সেখানে গিয়ে টাকা দাবি করে। তাদের টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় শাটারিং ভেঙে কাজ বন্ধ করে দেয়। ফের কাজ শুরুর প্রস্তুতি চলছে। স্থানীয়রা জানান, বিভিন্ন জায়গায় কালভার্ট তৈরির জন্য রাস্তা কেটে রাখা হয়েছে। ফলে গোপালপুর চা বাগানের ভিতর দিয়ে দলমোর চা বাগান পর্যন্ত চার মাস ধরে কোনও গাড়ি চলাচল করতে পারছে না। গোপালপুর চা বাগানের বাসিন্দা তথা চা বাগান তৃণমূল কংগ্রেস মজদুর ইউনিয়নের সদস্য উত্তম সাহা বলেন, আমরা চাই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে দ্রুত কাজ শুরু করা হোক। চাঁপাগুড়ির বাসিন্দা ইউসুফ আলি বলেন, রাস্তাটি বিভিন্ন জায়গায় কেটে রাখা হয়েছে। তার ওপর কাটা পাথরগুলি বিপজ্জনকভাবে বেরিয়ে রয়েছে। ফলে চলাচল করা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। ওই রাস্তা পুনর্নির্মাণের কাজের সঙ্গে জড়িত এক ব্যক্তি জানান, একটি রাজনৈতিক দলের এক নেতা প্রোটেকশন দেওয়ার নাম করে কয়েক লক্ষ টাকা আদায় করেন ঠিকাদারের কাছ থেকে। কিন্তু বর্তমানে তিনি আগের পদে নেই। তাই তাঁর প্রভাবও আর খাটছে না। এই সুযোগে ঠিকাদারের লোকজনের ওপর চোটপাট করছে এলাকার খুদে নেতারা। আলিপুরদুয়ার জেলা পরিষদের সভাধিপতি শীলা দাস সরকার বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে পদক্ষেপ করা হবে।