জাল বিছিয়েছে রোহিঙ্গারা, সূত্র খুঁজতে উত্তরবঙ্গে এনআইএ

180
সংগৃহীত

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি: উত্তর-পূর্ব ভারতে সক্রিয় হচ্ছে রোহিঙ্গা জঙ্গি সংগঠন আকা মূল মুজাহিদিন (এএমএম)। পশ্চিমবঙ্গেও জাল বিছিয়েছে এএমএম। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে এখবর জানা গিয়েছে। সূত্রের আরও খবর, বাংলাভাষী অধ্যুষিত এলাকায় সংগঠন ছড়াতে উত্তরবঙ্গে ঢুকেছে এএমএম-এর তিন কমান্ডার। তাদের ধরতেই অভিযান শুরু করেছে এনআইএর একটি বিশেষ দল। রোহিঙ্গা জঙ্গিদের নিয়ে উদ্বিগ্ন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকও। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সফরে এসে কলকাতার একটি হোটেলে বসে এনআইএ আধিকারিকদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা। কড়া পদক্ষেপ করতে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। তারপরই এএমএমের খোঁজে উত্তরবঙ্গের পাশাপাশি উত্তর-পূর্ব ভারতেও হানা দিয়েছেন এনআইএ আধিকারিকরা।

গত কয়েকদিনে ইন্দো-মায়ানমার সীমান্তের একাধিক এলাকায় অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছেন তাঁরা। অসম রাইফেলস এবং বিএসএফের সঙ্গে এনআইএ কর্তাদের বৈঠক হয়েছে। কোচবিহার, দক্ষিণ দিনাজপুর ও মালদার বেশ কিছু এলাকায় নজরদারি শুরু করেছেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা। সূত্রের খবর, পাহাড়ের কয়েকটি জায়গাতেও গিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা আধিকারিকরা। দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ের সন্দেহভাজন কিছু এলাকার উপর নিয়মিত নজর রাখছেন তাঁরা। গোয়েন্দাদের কাছে আরও খবর পৌঁছেছে, এএমএম এবং রোহিঙ্গাদের অন্য একটি জঙ্গি সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সলভেশন আর্মি (এআরএসএ)-র জন্য হাওলার মাধ্যমে টাকা নিয়ে তহবিল গঠনের কাজ শুরু হয়েছে। আর সেই তহবিলে রাজ্য থেকেও হাওলার মাধ্যমে টাকা গিয়েছে। তবে এআরএসএ রাজ্যে ঘাঁটি গেড়েছে কি না সে সম্পর্কে এখনও স্পষ্ট কোনও তথ্য জানতে পারেননি গোয়েন্দারা। রোহিঙ্গাদের ঠেকাতে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে হাউস টু হাউস ভেরিফিকেশন কার্যক্রম করার জন্য পদক্ষেপ করছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেন, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে যাবতীয় পদক্ষেপ করা হয়েছে। সীমান্তরক্ষী ও আধাসামরিক বাহিনীগুলিকেও প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেশবিরোধী সব রকমের কার্যকলাপ কড়া হাতে মোকাবিলা করা হবে।

- Advertisement -

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গিয়েছে, একটি কমিটি দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে এএমএম। সেই কমিটির বেশিরভাগ সদস্যই সৌদি আরব, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে নাম বদলে বসবাস করছে। এখনও পর্যন্ত গোয়েন্দাদের কাছে যে তথ্য এসেছে সেই তথ্য অনুসারে, হাফিজ তোহার নামে বছর ৪৭-এর এক জঙ্গি বর্তমানে এএমএম-এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন।   হাফিজ নিজেও একজন রোহিঙ্গা। সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হরকত-উল-জিহাদ ইসলামি আরাকান-এর প্রধান আবদুস কাদুস বুরমি এএমএম-এ হাফিজ তোহারকে নিযোগ করেছিলেন। তিনিই পাকিস্তানে হাফিজের প্রশিক্ষণের বন্দোবস্ত করেছিলেন এবং তাঁর হস্তক্ষেপেই হাফিজ এএমএম প্রধান হয়েছেন। বুরমিও রোহিঙ্গা বংশোদ্ভূত বলেই গোয়েন্দাদের কাছে খবর পৌঁছেছে। বুরমি পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদী সংগঠন জইশ-ই-মহম্মদ এবং আল-কায়দার সহযোগী হিসাবেই কাজ করেন। তাঁর হাত ধরেই এএমএম-এর সঙ্গে জইশ এবং আল-কায়দার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ওই দুই সংগঠন এএমএম-কে যাবতীয় সহযোগিতা করছে। প্রশিক্ষণ, অস্ত্র, সংগঠন বৃদ্ধির কৌশল, অর্থ- সব দিয়ে জইশ ও আল-কায়দা এএমএম-কে সহযোগিতা করছে বলেই খবর। বাংলাদেশের নিও জামাত-উল-মুজাহিদিনিদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে এএমএম-কে সহযোগিতা করার প্রমাণ পেয়েছেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা। ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট কাউন্সিল অফ নাগাল্যান্ড (এনএসসিএন)-এর শীর্ষস্থানীয় দুই কমান্ডারের সঙ্গে সম্প্রতি মালয়েশিয়ায় এএমএম-এর কয়েকজন কর্তার তিন দফায় বৈঠক হয়েছে বলেই গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন। উত্তর-পূর্ব ভারতে এনএসসিএন-এর শক্তিশালী সংগঠন আছে। তাদের সঙ্গে এএমএম-এর সমঝোতা হলে তা ভারতের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষার ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হতে পারে বলেই মত এনআইএ কর্তাদের একাংশের।

উত্তরবঙ্গে মালদার বামনগোলা, কালিয়াচক, কোচবিহারের শীতলকুচি, জারিধরলা, বক্সিরহাট, দক্ষিণ দিনাজপুরের হিলি, দার্জিলিং ও কালিম্পং পাহাড়ের চারটি এলাকা, শিলিগুড়ি শহরের কয়েকটি ওয়ার্ড এবং শহর লাগোয়া মাটিগাড়া, মুর্শিদাবাদের শেখপাড়া, সাগরপাড়া, উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়া জেলার ছয়টি সীমান্ত এলাকা এবং সীমান্ত গ্রাম হরিদাসপুরে বিশেষ নজরদারি শুরু করে দিয়েছেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা। নিউ আলিপুরদুয়ার, নিউ জলপাইগুড়ি ও মালদা রেলস্টেশন, শিলিগুড়ি জংশন বাস টার্মিনাস এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। আগরতলা থেকে ভারতের যে কোনও প্রান্তে যাওয়া প্রতিটি ট্রেনে বিশেষ তল্লাশি শুরু করেছেন গোয়েন্দারা। রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্স (আরপিএফ)-এর কাছেও সন্দেহভাজনদের তথ্য দিয়ে দিয়েছে এনআইএ। ত্রিপুরার সীমান্ত পার করে বাংলাদেশের কক্সবাজার থেকে এএমএম-এর তিন কমান্ডার ভারতে ঢুকেছে বলেই খবর পেয়েছেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা। সেখান থেকে অসম পার করে সড়কপথে তারা উত্তরবঙ্গে এসেছে। তিনজনের একজন মুর্শিদাবাদে ঘাঁটি করে আছে বলেই সন্দেহ করছেন গোয়েন্দা কর্তারা। সূত্রের আরও খবর, হায়দরাবাদ ও কাশ্মীরে নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে এমন কয়েটি সন্দেহভাজন ফোন কলও ট্র‌্যাক করা হচ্ছে। সম্প্রতি নিউ জলপাইগুড়ি রেলস্টেশনের কাছ থেকে কয়েকজন রোহিঙ্গাকে গ্রেপ্তার করেছে আরপিএফ। চলতি মাসের ২২ তারিখ অসমের করিমগঞ্জ জেলা পুলিশ অসম-ত্রিপুরা সীমানার চুরাইবাড়ি থেকে ১৩ জন রোহিঙ্গাকে গ্রেপ্তার করে। ত্রিপুরা সীমান্ত থেকে নভেম্বর মাসেও গ্রেপ্তার হয়েছে ২২ জন রোহিঙ্গা। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা গ্রেপ্তার হওয়া রোহিঙ্গাদের কয়েকজনকে দফায় দফায় জেরা করে বেশ কিছু তথ্য পেয়েছেন বলেই খবর। সেই খবরের ভিত্তিতে অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে এনআইএ। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় যাযাবরদের নামে থাকা অস্থায়ী ক্যাম্পগুলির উপরও কড়া নজর রাখা হচ্ছে বলেই জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা।