ভারতীয় রাজনীতির অঙ্গনে মেয়েরা : শরীর, শরীর আর শরীর, কাজ নাই?

103

ভারতীয় রাজনীতির অঙ্গনে মেয়েরা : শরীর, শরীর আর শরীর, কাজ নাই?| Uttarbanga Sambad | Latest Bengali News | বাংলা সংবাদ, বাংলা খবর | Live Breaking News North Bengal | COVID-19 Latest Report From Northbengal West Bengal Indiaতৃষ্ণা বসাক

সাথিদের খুনে রাঙা স্মৃতিপথে
ফিউচার শক। অ্যালভিন টফলারের বইটা পড়তে দিয়েছিলেন তমালদা। নকশাল আন্দোলনের ডাকে যাঁর মেকানিক্যালের ডিগ্রিটা শেষ করা হয়নি। সমাজ পালটাতে গিয়ে সমাজের প্রান্তিক মানুষ হিসেবে বেঁচে রইল শেষ পর্যন্ত। যতদিন না ক্যানসার এসে ইতি টেনে দিল তাঁর জীবনে। তাঁর পত্রিকায় বোধহয় কুন্দেরার একটা গল্পের অনুবাদ চোখে পড়েছিল। History is as light as individual human life, unbearably light, light as a feather, as dust swirls into the air, as weather will no longer exist tomorrow. কুন্দেরার এই পাঠে পৌঁছোনোর আগে বিগত তিন দশক ধরেই আমি, আমার ইতিহাস, এই রাজ্য, এই রাষ্ট্র, এই পৃথিবীর ইতিহাস চোখের সামনে কেমন গুঁড়ো গুঁড়ো ধুলো হয়ে গেল।

- Advertisement -

সেই তমালদা একবার তাঁর এক বান্ধবীর কথা বলেছিলেন। তাঁর এক কমরেড। দীর্ঘদিন আত্মগোপন পর্বে ভালো করে স্নান করতে পারেননি। তাঁর সারা গায়ে উকুন বাসা বেঁধেছিল। দীর্ঘদিন রাজনীতির মেয়ে বলতে তাঁর সেই উকুনগুলোর কথা মনে পড়ত। সেই জীবনের কিছুটা ধারণা হয়তো আমরা পাই জয়া মিত্রের হন্যমান কিংবা মীনাক্ষী সেনের জেলের ভেতরে জেল পড়লে। বাঁধা চাকরি, ঘর-সংসার, শরীরের যত্ন সব ছেড়ে রাজনীতি করা মেয়েরা কেমন হয়, তার ছবি আমার আশৈশব দেখা।

গূঢ় মফসসল। তার দেওয়ালগুলো দগদগে লাল। শুধু মূল সড়ক নয়, পাড়ার গলিঘুঁজি দিয়ে প্রায়ই যায় মিছিল। ছেলেরা একা নয়, মেয়েরাও থাকেন মিছিলে। কেমন ক্ষয়া-খপ্পুরে, গামছা নিংড়ানো চেহারা তাঁদের। অপুষ্টি কেড়ে নিয়েছে শ্রী। ওঁদের ডাকা হয় পার্টি করা মেয়ে বলে, যাঁদের বিয়ে হওয়ার কোনও দূরতম সম্ভাবনা নেই। আর যদি বিয়ে হয়ও, মোটেই সুখকর হয় না তার পরিণতি।

একবার আমাদের এক চেনাশোনা কমিউনিস্ট পরিবারে বাড়ির সবচেয়ে রূপবান ছোট ছেলেটি তেমন এক পার্টি করা মেয়েকে বিয়ে করে আনল। খুব রেখেঢেকে বললেও, মেয়েটি বড় কুশ্রী। আমরা দেখতে পেলাম দরিদ্র ঘর থেকে আসা, অসুন্দর সেই মেয়েটিকে পদে পদে অপমানিত হতে হচ্ছে সেই সাম্যবাদী পরিবারে। প্রান্তিক মানুষের মতো তিনি বেঁচে রইলেন। প্রগতিশীল স্বামীও তাঁকে উপেক্ষা করতেন।

আধা নয়, তেভাগা চাই
বাবার প্রিয় কমরেড নেতা কিংবদন্তি ইলা মিত্রের কাছেও নিয়ে গেলেন রণেশদা। বাবার দেখাদেখি আমিও পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলাম ইলা মিত্রকে। এখনও মনে হলে সারা দেহ রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে। তখন কিন্তু এই মহান মানুষটি সম্পর্কে তেমন কিছু জানা ছিল না। শুধু শুনেছিলাম, তিনি নাচোলের রানি। তিনি তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী। আরও শুনেছিলাম, তিনি একজন মহান বিপ্লবী কমিউনিস্ট। রানি শুনলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে দামি পোশাক, গয়না, মাথায় সোনার মুকুটের ছবি। কিন্তু ইলা মিত্র এসবের সম্পূর্ণ বিপরীত। ছোটখাটো গড়নের, সাদামাঠাভাবে শাড়ি পরা একজন নারী। তাঁকে আমার লেনিন কবিতাটি শোনাবার পর কী যে আদর করেছিলেন। (ঢাকার মেয়ে বাঙ্গালনামা, শান্তা মারিয়া, উদ্যান বর্ষ ২২, সংখ্যা ৫, সম্পাদক তৌফিক জহুর)

আবার তেভাগা আন্দোলনের আরেক বিখ্যাত নেত্রী বিমলা মাজি। অসামান্য রূপসী হলেও তাঁর কাজই প্রাধান্য পেয়েছে। তাঁর শারীরিক রূপ কখনও আলোচনায় আসেনি। তবে রূপের জন্য তাঁকে অনেক অসুবিধেয় পড়তে হয়েছে। তা জানা যায় তাঁর ছেলে কবি বিপ্লব মাজির স্মৃতিচারণে। তেভাগার জন্য মেয়েদের প্রস্তুত করার সময় বিমলা মাজিকে রাতে সভা সেরে প্রায়ই শ্মশানে বিশ্বস্ত কমরেডদের সঙ্গে রাত কাটাতে হত। কখনও কারও বাড়িতে আশ্রয় নিতে হত। …ধরা পড়ার ব্যাপারে মায়ে বিপদ ছিল যে, মা দেখতে সুন্দরী ছিলেন, ফলে কৃষক মেয়ে হিসাবে কৃষক মেয়েদের মধ্যে চট করে লুকিয়ে পড়তে পারতেন না…

আগুনের ব্যবহার
চার অধ্যায়-এর এলার রূপ নিয়ে সংশয়ে ছিলেন তাঁর রাজনীতির সহকর্মীরা। কানাই বললেন … এলার মতো সুন্দরী সর্বদা দেখতে পাওয়া যায় না – এ কথা মানো কি না? মানি বৈকি। তাহলে ওকে তোমাদের মধ্যে রেখেছ কোন সাহসে?… আগুনকে যে ভয় করে, সে আগুনকে ব্যবহার করতে পারে না। আমার কাজে আমি আগুনকে বাদ দিতে চাই নে। ঘরে  বাইরে-এর বিমলা প্রথাগত সুন্দরী ছিলেন না। কারণ তাঁর রং ছিল শ্যামলা। কিন্তু তাঁর শরীরের দাহিকা শক্তিকে রাজনীতিতে ব্যবহার করতে চেয়েছিল সন্দীপ।

মক্ষী যে সুন্দরী সেটা আমার আবিষ্কার। লম্বা ছিপছিপে গড়ন, যাকে আমাদের রূপরসজ্ঞ লোকেরা নিন্দে করে বলে ঢ্যাঙা। ওর ওই লম্বা গড়নটিই আমাকে মুগ্ধ করে… ওর রং শ্যামলা, কিন্তু সে যে ইস্পাতের তলোয়ারের মতো শামলা – কী তেজ আর কী ধার! যতদিন ভারতীয় নারীর রাজনীতি এলিট ক্লাসের মধ্যে সীমিত ছিল, ততদিন রূপের মাপকাঠিও ছিল ছাঁচে ঢালা। ইন্দিরা থেকে প্রিয়াংকা, এঁরা হয়তো ভাবতে বাধ্য করেছেন নেত্রীরা ফর্সা, গ্ল্যামারাস হবেন। তাই আঁধি সিনেমার জন্য সুচিত্রা সেন ছাড়া কাউকে ভাবা হয়নি।

কেতকী কুশারী ডাইসনের নোটন নোটন পায়রাগুলির প্রথম পাতাতেই আছে ঊর্মিলা নামে এক নেত্রীর কথা। পাতলা ফর্সা চেহারা, বাদামি চুল ব্যাকক্লিপ দিয়ে আটকানো। তাঁর স্নিগ্ধ রূপটির মধ্যেই যেন আটকে থাকে কেমন মহিলা নেত্রী আমরা চাই – ইচ্ছের প্রতিমা। যদিও গান্ধিজির ডাকে পথে নামা মেয়েরা, পরে বামপন্থী মেয়েরা এই রূপের ছাঁচ ভেঙে বেরিয়ে গিয়েছেন তাঁদের কাজের মাধ্যমে।

কাজ দিয়ে দ্বার খোলাব
নয় দশক মানে এক বিপুল ভাঙচুর। ভেঙে গেল সোভিয়েত ইউনিয়ন, বিশ্বায়নের ঝড় দুনিয়ায়, ভুবনগ্রামে ভোগবাদের জয়জয়কার। সেই বৃত্ত সম্পূর্ণ হল সোশ্যাল মিডিয়ার দাপাদাপিতে। ট্রোলিং। বিশেষ করে মেয়েদের।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইন্ডিয়া জানিয়েছে, ভারতের নারী রাজনীতিকরা ব্রিটেন এবং আমেরিকার নারী রাজনীতিকদের চেয়ে অনেক বেশি অনলাইন হেনস্তার শিকার হন। ২০১৯-এর নির্বাচনে প্রায় ১০০ জন নেত্রী টুইটারে খুন এবং ধর্ষণের হুমকি পেয়েছিলেন। মুসলিম নেত্রীরা অন্য ধর্মের চেয়ে ৯৪.১ শতাংশ বেশি বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য শুনেছেন। নিম্নবর্গের নেত্রীরাও একই রকম টিটকিরির শিকার।

এই মুহূর্তে ফেসবুক ছেয়ে গিয়েছে একটি মিমে, যেখানে গ্ল্যামারাস ফিল্মস্টার নেত্রীদের তুলনায় সাধারণ, মেকআপহীন চেহারার রাজনীতির মাটি কামড়ানো মেয়েদের জৌলুসহীনতা-কে কটাক্ষ করা হচ্ছে। এইসব মেয়েদের বলা হচ্ছে কাজের মাসি। নারী রাজনীতিকদের নিয়ে বডি শেমিং আগেও ছিল অবিশ্যি। জ্যোতি বসু একাধিকবার মুক্তিযুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধির ভূমিকার কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, উনি তো সেইসময় বাংলাদেশের হিরোইন। ইন্দিরা সম্পর্কে বলা হত, উনি  শাড়ি পালটানোর মতো ক্যাবিনেট বদলান। সুতরাং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে বারমুডা পরতে বলার সেক্সিস্ট এবং মিসোজেনিস্ট ঝোঁক পুরুষপ্রধান রাজনৈতিক ঐতিহ্যের মধ্যেই পড়ে বোধহয়!

এলার রূপ কোনও দিন স্বস্তি দেয়নি পুরুষদের। কলেজে পড়ার সময় বোর্ডে যা তা লিখত তারা, পিছন থেকে চ্যাঁচাত ছোট এলাচ বলে। এত উৎপাতে অন্য মেয়েরা রাগ করলেও এলা করত না। সে জানত আমরা ওদের চোখে অনভ্যস্ত। তাই ওদের ব্যাপারটা হয়ে পড়ে এলোমেলো, কদর্যও হয় কখনো-কখনো। কিন্তু সেটা ওদের পক্ষে স্বাভাবিক নয়। যখন অভ্যেস হয়ে গেল, সুর আপনি এল সহজ হয়ে ভারতীয় রাজনীতিতে মেয়েদের দেখার অভ্যেস হতে আর কত বাকি?

(লেখক কবি-সাহিত্যিক)