জেদের জেরে রুক্ষ জমি এখন খেলার মাঠ

- Advertisement -

শুভজিৎ দত্ত, নাগরাকাটা : হাল ছেড়ো না বন্ধু বরং কণ্ঠ ছাড়ো জোরে…। কবীর সুমনের এ গান নাগরাকাটার প্রত্যন্ত ক্যারন চা বাগানের বাসিন্দা বিনোদ, প্রদীপ, আশিস বা গৌরব শুনেছেন কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তবে অসুর সম্প্রদায়ে এই প্রতিনিধিরা যে হাল না ছাড়ার মন্ত্রে পুরোপুরি বিশ্বাসী তা নিয়ে কোনও সন্দেহই নেই। ব্যবহারের উপযুক্ত না হওয়ায় এক বিঘারও বেশি জমি এতদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে ছিল। বিনোদরা ওই রুক্ষ জমিতে দিনের পর দিন কোদাল-বেলচা চালিয়ে তা মসৃণ করে ফেলেছেন। এলাকায় খেলাধুলোর কোনও ব্যবস্থা না থাকায় প্রদীপরা এতদিন মুষড়ে থাকতেন। এবারে অবশ্য সেই সমস্যা আর থাকল না। আশিসদের মুখে এখন হাজার ওয়াটের হাসি উজ্জ্বল। অসুর সম্প্রদায় দুর্গাপুজো করে কি না তা নিয়ে তর্কবিতর্ক রয়েছে। হার না মানার মন্ত্রে পাওয়া মাঠটিকে গৌরবরা নিজেরাই নিজেদের দেওয়া পুজোর উপহার হিসাবে দেখছে।

ক্যারন বাগানের কারি লাইনের বাসিন্দা অসুর সমাজের সম্পাদক সুরেশ ওরাওঁ বলেন, একটা মাঠ না থাকায় এখানকার ছেলেগুলো রীতিমতো মুষড়ে থাকত। এখন ওদের মুখে সবসময় হাসি দেখে যে আমাদের কী আনন্দ হয় তা বলে বোঝাতে পারব না। বিনোদদের সাহায্যে হাত বাড়িয়ে দেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা ধনবীর সিং বলছেন, এখানে এতদিন খেলাধুলোর চর্চা বলতে গেলে ছিলই না। এই মাঠ ওদের সেই অপ্রাপ্তি ঘুচিয়ে দিল। বাগানের যে জায়গাটিতে খেলার মাঠটি তৈরি করা হয়েছে সেই এলাকাটি কারি লাইন হিসেবে পরিচিত। এই জায়গাটিই অসুর সম্প্রদায়ভুক্ত বাসিন্দাদের মূল ডেরা। ৫২টি পরিবারের বসবাস। সন্ধ্যা নামলেই এলাকা এতটাই নিঝুম হয়ে পড়ে যে একটা পিন পড়লেও বোধহয় তার শব্দ শোনা যাবে। ভুটান সীমান্তে থাকা ঢেউখেলানো জায়গাটিতে সভ্যতা যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। বিনোদন বলতে কার্যত কিছুই নেই। এর মাঝেও অসুরদের অনেকে স্কুলে যায়। এখানকার যুবকদের অনেকেই সংসার চালাতে ভুটানে গিয়ে দিনমজুরি করেন। লকডাউনের জেরে ওই কাজ হারিয়ে অবশ্য তাঁরা বিপাকে। যে পরিবারগুলির সদস্যদের বাগানে শ্রমিকের কাজ নেই তাদের দুরবস্থা চরমে উঠেছে।

বছর দুয়েক আগে বাগানের এই লাইনে একটি প্রাথমিক স্কুল চালু হয়। কোনও কাজে ব্যবহারের উপযুক্ত না হওয়ায় স্কুলের সামনে এক বিঘারও বেশি জমি এতদিন এমনিই পড়ে ছিল। পাথুরে ও উঁচু-নীচু ওই রুক্ষ জমিতেই দিনের পর দিন কোদাল-বেলচা চালিয়ে সেখানকার ছাত্র-যুবকের দল মসৃণ করে ফেলেছেন। বর্ষায় পাশের পাহাড় থেকে কেটে এনে এখানে ঘাস লাগানো হয়েছে। তাতে এখন মখমলি সবুজের স্নিগ্ধ আভা। সেখানে সকাল-বিকেল দুবেলাই ফুটবল নিয়ে মাতামাতি। দূষণ ও কোলাহল থেকে অনেক দূরে থাকা দারুণ সুন্দর জায়গাটিতে থাকা মাঠে চলছে শরীরচর্চাও। বিনোদ অসুর, প্রদীপ অসুর, অনিল অসুর, প্রেমকুমার অসুর কিংবা মানিক অসুরদের মতো ২৪-২৫ বছরের মতো যুবকরা তো ছিলেনই, মাঠ তৈরিতে অপটু হাতেই জমি থেকে পাথর তুলতে গাঁইতি-শাবল চালিয়েছে পঞ্চম শ্রেণির আশিস অসুর, সপ্তমের গৌরব বা অষ্টমের নিকেশ অসুরদের মতো অনেকেই। সোমবার পড়ন্ত বিকেলে ফুটবলে লাথি মারতে মারতেই ওই পড়ুয়ার দলের স্বগতোক্তি, এরপর ক্রিকেটও খেলব। কী মজাই না হবে তখন!

অসুর কিশোর-যুবকদের এমন কাজ দেখে ডুয়ার্সের গ্রিন লেভেল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি নামে একটি সংগঠন মানিকদের পাশে দাঁড়িয়েছে। সংস্থার পক্ষে অনির্বাণ মজুমদার বলেন, মাঠের চারপাশে গাছ লাগিয়ে দেব। ওদের কিছু ফুটবল দেওয়ার পাশাপাশি আরও কিছু সামগ্রী দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অনিলদের একাজের প্রতি সম্মান জানাতে সম্প্রতি ওঁদের হাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু সামগ্রী তুলে দেওয়া হয়েছে।

- Advertisement -