বাবা বিশ্বনাথ এখনও স্বপ্নে বিভোর

81

রূপায়ণ ভট্টাচার্য, বালুরঘাট : শহরের ব্যস্ত এলাকা সাধনা মোড়ে তখন সব দোকানপাট বন্ধ। রাত এগারোটা বাজতে চলেছে। আলো জ্বলছে শুধু আরএসপি অফিসে। বিশ্বনাথ চৌধুরী তখনও আছেন।

সামান্য বাদে রাজ্য আরএসপি-র সবচেয়ে সক্রিয় নেতার সঙ্গে কথা বলে বেরিয়ে আসার সময় মনে হচ্ছিল, সাদা ধুতি-পাঞ্জাবির এমন সততার প্রতিমূর্তিগুলো কি বঙ্গ রাজনীতিতে শেষ হয়ে এল? রাজনীতির এই প্রজন্ম হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমেই। সকাল নটা থেকে দুপুর আড়াইটে পর্যন্ত পার্টি অফিসে। বাড়িতে লাঞ্চ সেরে সাড়ে তিনটেয় অফিসে ফিরে গ্রামের দিকে জনসংযোগে যাওয়া। রাতে ফিরে সাড়ে দশটা-এগারোটা পর্যন্ত অফিস। কোভিডেও অকুতোভয়।

- Advertisement -

বিশ্বনাথের কাছে শুনলাম, আটাত্তর বছর বয়সেও তাঁর এই রুটিন। সেদিনও ঘুরে এসেছেন কাছের গ্রাম। কথা বললে হয়তো আরও অনেক রাত পর্যন্ত সাক্ষাৎকার চালিয়ে যেতেন। তখনও অফিসে বেশ কিছু প্রবীণ বসে। কথা বলার মাঝে, বারবার ফোন আসছে বিভিন্ন মানুষের। নানা শহর থেকে। আরএসপি-র সাধারণ সম্পাদক পরামর্শ দিয়ে চলেছেন। পার্টিগত, ব্যক্তিগত। ১৯৭৭ থেকে টানা সাতবারের বিধায়ক হয়েছেন কি সাধে! সবাইকে এখনও নামে চেনেন।

সিপিআই, ফরওয়ার্ড ব্লক, আরএসপি-র মতো পার্টিগুলোর অবস্থা এই নির্বাচনে আরও করুণ। সমর্থন তো কমেছেই, তরুণ প্রজন্ম আর আসছে না। এই মার্চে ৮১ বছর হল ত্রিদিব চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত পার্টি আরএসপির। রাজ্যে প্রভাব কমছে তো কমছেই। বালুরঘাটের বাবা বিশ্বনাথ সেটা মানতে চাইলেন না। নিজের পার্টির বেশ কয়েকজনের নাম করে তাঁর মন্তব্য, অন্য পার্টির কথা বলতে পারব না। কিন্তু আমাদের পার্টিতে অনেক নতুন ছেলেমেয়ে উঠে আসছে। অত্যন্ত সৎ ও ভালো মানুষ  হিসেবে পরিচিত।

বিশ্বনাথ ২০১১ সালে প্রথম হারলেও অষ্টমবার বিধায়ক হন গত বিধানসভায়। এবার আর দাঁড়াননি ভোটে। দাঁড় করিয়েছেন আরএসপি নেতা সুচেতা বিশ্বাসকে। গতবারই পার্টিকে বলে দিয়েছিলাম, আর দাঁড়াব না। নতুন প্রজন্মকে তুলে আনতে হবে। আমি তো সব সভায় সুচেতার সঙ্গে থাকছি। ব্যাখ্যা বিশ্বনাথের।

বিজেপি হাওয়ায় টলমল বিশ্বনাথের আসন। শহরে যেন হঠাৎ ফিরে এসেছে ২০১১ সালের পরিবর্তনের বাতাস। বিশ্বনাথ ভাবতে নারাজ। প্রত্যয়ের সঙ্গে তাঁর পালটা দাবি, আমরাই জিতব দেখবেন। বালুরঘাট কোনওদিন কোনও বহিরাগত প্রার্থীকে জেতায়নি। যতীন চক্রবর্তীর মতো লোককে হারতে হয়েছিল এখানে দাঁড়িয়ে। কোভিডের প্রথম ঢেউয়ের সময় সরকারি কর্তারা কোনও সার্টিফিকেটে সই করেন না সংক্রমণের ভয়ে। বিশ্বনাথ দিনে দেড়শো সার্টিফিকেটে সই করে গিয়েছেন গ্লাভস পরে। স্যানিটাইজার ব্যবহার করে। আরএসপি নেতা আশায়, তার প্রভাব ভোটে পড়বে।

সমস্যা হল, সেদিনের বালুরঘাটের সঙ্গে আজকের বালুরঘাটের ফারাক অনেক। প্রতিপক্ষের ভাবনাও অনেক পালটে গিয়েছে। যেন খেলার মতো নানা স্ট্র‌্যাটেজি, ট্যাকটিক্স। শহরের এক নামী হোটেলের রেস্তোরাঁয় বসে দেখা গেল, জনা সাত-আট হিন্দিভাষী তরুণ কথা বলছেন নির্বাচন নিয়ে। পরে শুনলাম, এঁরা উত্তরপ্রদেশ-মহারাষ্ট্র থেকে এসেছেন বিজেপির হয়ে কাজ করতে। তৃণমূলের পিকের টিমের অনেকে অনেকদিন ধরে ঘাঁটি গেড়েছেন এখানকার বড় হোটেলে। সেখানে আবার বিজেপির লোকেরাও উঠেছেন। বুথের অঙ্কে প্রচারে জোর দেওয়া হচ্ছে।

বালুরঘাট স্টেট বাসস্ট্যান্ডের কাছে রাস্তাটা সামান্য অল্প জায়গায় ভাগ হয়ে সমান্তরাল চলেছে অদ্ভুতভাবে। একদিকে গান্ধিমূর্তি, আরেকদিকে নেতাজির। অদূরে কংগ্রেস ভবন কার্যত নিঃসঙ্গ। সেখানে দুই তরুণের সঙ্গে কথা হল সকালে। একজন ব্যবসায়ী, একজন সরকারি চাকরিজীবী। একই কথা দুজনের, বিশ্বনাথবাবু সৎ লোক। কিন্তু বামফ্রন্ট ওঁকে শুধু পঁচিশ বছর কারামন্ত্রী করে রেখেছিল। ভালো গুরুত্ব দেয়নি। সিদ্দিকির সঙ্গে বামেদের জোট বালুরঘাটে মানতে পারেনি কেউ। তাছাড়া ওরা তো ক্ষমতায় আসতে পারবে না।

শেষ দুটো কথাই বিশ্বনাথ উড়িয়ে দিয়েছিলেন আগের রাতের সাক্ষাৎকারে। আমি এখনও আশাবাদী, সংযুক্ত মোর্চা জোটই ক্ষমতায় আসবে। শোনার পরে জানতে চাই, কটা আসনের আশা করছেন? ভদ্রলোক কোনও সংখ্যা বলতে রাজি হলেন না। বালুরঘাটের প্রতি অবিচারের প্রতিবাদে জেল যাওয়া দিয়ে রাজনীতি শুরু করেছিলেন বিশ্বনাথ। তখন পড়তেন ক্লাস সেভেনে। মালদা জেলে তাঁকে টেনেছিল বেলফুলের ঝাড়। পরে কারামন্ত্রী হয়ে সেখানে আরও বেলফুলের গাছ লাগানোর ব্যবস্থা করেছিলেন।

সিদ্দিকি জোটে আসায় কি বামেদের ভাবমূর্তির ক্ষতি হয়েছে? বিশ্বনাথের জবাব, সিদ্দিকি কিন্তু অধিকাংশ জায়গায় মুসলিম প্রার্থী দেননি। অনেক আদিবাসী নেতা রয়েছে ওঁর সঙ্গে। আমি আপনার কথা মানতে পারলাম না।

উত্তরবঙ্গে কুমারগ্রাম, কালচিনির মতো জায়গায় আরএসপি কিছুদিন আগেও পরপর বিধায়ক দিয়েছে। এখন যা ভাবাই যায় না। কুমারগ্রামে দশরথ তিরকি, মনোজ ওরাওঁয়ের মতো লোকেরা বিধায়ক হয়ে এখন বিজেপিতে। বিশ্বনাথ সেটা মানলেন, চা বাগানের দিকে আগে সমস্যা হয়েছে। সেখানে আমরা সম্প্রতি নজর দিয়েছি।

রাত বাড়ে এবং আশি ছুঁইছুঁই বিশ্বনাথের সক্রিয়তা দেখে মনে পড়ে যায়, ইদানীং কলকাতাকেন্দ্রিক রাজনীতি বাংলায় এত বেড়েছে যে, জেলা শহরগুলোতে এমন দাপুটে নেতা দেখা যায় না। দিনহাটা শহরে ঢোকার মুখে কমল গুহের মতো নেতার বিশাল স্মৃতিস্তম্ভ। শিলিগুড়িতে অশোক ভট্টাচার্য এখনও রয়েছেন, কিন্তু সিপিএম তাঁকে রাজ্যে গুরুত্বই দিল না। রাজ্যে প্রভাব ফেলা এমন নেতা উত্তরবঙ্গে আর কই?

এখনকার বঙ্গ রাজনীতির কোন দিকগুলো তাঁকে কষ্ট দেয় জানতে চাইলে দুটো-তিনটে ব্যাপার উল্লেখ করলেন বিশ্বনাথ। এখনকার রাজনীতিতে মারামারি খুব বেড়ে গিয়েছে। স্বচ্ছতার খুব অভাব। ভোটে একটা পার্টির হয়ে জিতে আরেকটা পার্টিতে চলে যাচ্ছে। এত দুর্নীতি বেড়ে গিয়েছে। কারও কোনও শাস্তি হচ্ছে না। মুখ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের ভাষা শুনলে অবাক হয়ে যাই। এসব কি ভাষণ? এঁরা সবাই এত মিথ্যা বলেন। আমরা মন্ত্রী থাকার সময় বিধানসভার প্রশ্নোত্তর পর্বে না থাকার কথা ভাবতেই পারতাম না। আর এখন মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় প্রশ্নের উত্তর দিতেই চান না।

আপনি ক্লাস সেভেনে রাজনীতিতে এসেছিলেন, এখনকার তরুণ প্রজন্ম কি রাজনীতিতে বিমুখ হয়ে পড়ল? বিশ্বনাথের ব্যাখ্যা, রাজ্য সরকার বেকার সমস্যায় নজর দিল না। এসএসসি দিনের পর দিন বন্ধ। চারদিকে বিশৃঙ্খল অবস্থা। তরুণরা হতাশ হয়ে পড়বেই। পঁচিশ বছরের কারামন্ত্রী না মানুন, বামফ্রন্ট সরকার ভেঙে যাওয়ার দশ বছর পরেও বামেদের পুনরুত্থানের আশা কিন্তু এবার নেই। বাম সরকার ব্যর্থ হল কেন? আরএসপি-র সোনার প্রজন্মের শেষ সর্বজনগ্রাহ্য নেতা বেশ সতর্ক এ প্রশ্নে, আমরা শেষদিকে নীচের তলায় ঠিকমতো কন্ট্রোল করতে পারিনি। কিন্তু আমরা নিজেরা ভুলত্রুটি স্বীকার করে নিয়েছি। বুদ্ধবাবু নিজেও সেটা বলেছেন।

এটা তেমন বিতর্কিত কথাই নয়। কিন্তু উঠে আসার আগে বিশ্বনাথ ফের বললেন, এই ব্যাপারটা ঠিকঠাক লিখবেন। আমরা কিন্তু ভুলত্রুটি স্বীকার করে নিয়েছিলাম। আরেকবার বোঝা গেল, বিশ্বনাথ চৌধুরী মোটেই ক্ষিতি গোস্বামী নন। স্পষ্ট বক্তা ক্ষিতি বারবার বিতর্কিত সত্য তুলে সমস্যায় ফেলতেন আরএসপি-কে, ফ্রন্টকে। সিপিএমের দাদাগিরির বিরুদ্ধেই সরব হয়েছেন কতবার। বালুরঘাটের বাবা বিশ্বনাথ এখনও দলের অনুগত সৈনিক। তাই উত্তরের পদ্মবাগানেও স্বপ্নের লালফুল দেখে চলেছেন।