মুক্তচিন্তার সাধক শচীমোহনের সংগ্রহশালা এখন মডেল

153

গৌতম সরকার, মেখলিগঞ্জ : বাড়ির নাম মুক্তচিন্তা। সাহিত্যে মুক্তচিন্তার অনুশীলন গৃহকর্তার সারাজীবনের সাধনা। লোকসংস্কৃতি চর্চায় ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো তাঁর নেশা। সরকারি-বেসরকারি কোনও সহায়তার তোয়াক্কাও করেন না। গাঁটের টাকায় লোকসংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্র, সংগ্রহশালা ও সাহিত্য চর্চা কেন্দ্র গড়ে তুলেছেন সদ্য অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শচীমোহন বর্মন। উত্তরবঙ্গের হারিয়ে যেতে বসা লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণে প্রায় ৩৭ বছর ধরে কাজ করে চলেছেন মেখলিগঞ্জ ব্লকের ১৪৭ ভোটবাড়ি গ্রামের বানিয়াপাড়ার এই বাসিন্দা। তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো সম্ভার রয়েছে তাঁর সংগ্রহশালায়। লোকবাদ্য যে কত আছে, তার ইয়ত্তা নেই। আছে লোকগানের নানা অনুষঙ্গও। গোরুর গাড়ি চড়ে মইষালদের (রাখাল) গানের যে ধারা উত্তরবঙ্গে রাজবংশী সমাজের অন্যতম সম্পদ, তার অনুষঙ্গ হিসেবে আস্ত একটি গোরুর গাড়িও রেখে দিয়েছেন সংগ্রহশালায়।

লোকসংস্কৃতির সংরক্ষণে ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজের বাড়ি মুক্তচিন্তা ভবনেই তৈরি করেছেন লোকসংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্র, সাহিত্য চর্চা কেন্দ্র, লোকসংস্কৃতি সংগ্রহশালা। রয়েছে গ্রন্থাগারও। নিজের হাতে তৈরি এই সাহিত্য স্কুলের নাম দিয়েছেন মুক্তচিন্তা সাহিত্য অনুশীলন কেন্দ্র। লোকসংস্কৃতি সংগ্রহশালায় রয়েছে নানারকমের বাদ্যযন্ত্র। প্রতিদিন সেখানে ভাওয়াইয়া সহ নানা লোকসংগীতের পাশাপাশি আবৃত্তি, গান, নাচও শেখানো হয়। শচীমোহনের কথায়, বিশ্বের আর কোথাও ব্যক্তিগত উদ্যোগে একাধারে সাহিত্য অনুশীলন কেন্দ্র, লোকসংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্র বা সংগ্রহশালা গড়ে উঠেছে বলে আমার জানা নেই।

- Advertisement -

শিক্ষক জীবনের উপার্জনের সিংহভাগ খরচ করেন মুক্তচিন্তার অনুশীলন, লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণে। নিজের বসতভিটেটাই দিয়েছেন সংগ্রহশালা, সাহিত্য চর্চা কেন্দ্রের জন্য। শুধু সংগ্রহশালায় সংরক্ষণ নয়, লোকসংস্কৃতির ধারাকে বাঁচিয়ে রাখতে একান্ত ব্যক্তিগত খরচে বানিয়াপাড়া গ্রামে তিনি লোকসংস্কৃতি মেলার আযোজন করেন। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের কবি, সাহিত্যিক, গুণীজনরা অংশ নেন তাতে। তার চেয়ে বড় কথা, এই মেলায় স্থান পায় লুপ্তপ্রায় নানা লোকগান, লোকনৃত্য। উত্তরবঙ্গের রাজবংশী সমাজের প্রাণের গান ভাওয়াইয়া অনুশীলনে এখন সরকারি উদ্যোগ আছে। কিন্তু কুশান, বিষহরার মতো বিপন্ন পালাগানগুলির ধারা এখন অবহেলিতই, কার্যত অন্তরালেই চলে গিয়েছে। নিজের উপার্জনের টাকায় কুশান ও বিষহরা পালার দল তৈরি করেছেন শচীমোহন। দোতারা, হরেকরকমের বাঁশের বাঁশি সহ উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতির অংশ প্রায় সব বাদ্যযন্ত্রই তাঁর সংগ্রহশালায় স্থান পেয়েছে। একক চেষ্টায় মুক্তচিন্তা লোকসংস্কৃতি সংগ্রহশালাটির যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৪ সালে। ২০১২ সাল থেকে বেশ কয়েকবার রাজ্য ভাওয়াইয়া উৎসবে তাঁর সংগৃহীত বাদ্যয়ন্ত্রের প্রদর্শনী হয়েছিল।

শচীমোহন নিজে একজন লোকশিল্পী। লোকসংস্কৃতি গবেষকও বটে। তাঁর স্ত্রী নন্দবালা বর্মনও শিল্পী। স্ত্রী সবসময় রয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত এই শিক্ষকের এই কর্মকাণ্ডের পাশে। চ্যাংরাবান্ধা হাইস্কুলে তিনি এতদিন শিক্ষকতা করেছেন। তাঁর বিষয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান। কিন্তু জীবনটাই কাটিয়ে দিলেন সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতি চর্চায়। গত জানুয়ারি মাসে তিনি অবসরগ্রহণ করেছেন। চাকরিজীবনে যা সঞ্চয় করেছেন, তা নিঃশেষে খরচ করেছেন স্বপ্নপূরণে। লোকজীবনের নানা অনুষঙ্গ ধরে রাখতে এই উদ্যোগ জরুরি হলেও সরকারি স্তরে তেমন নজর নেই। একক প্রচেষ্টায় শচীমোহনের কর্মকাণ্ড নিশ্চয়ই বর্তমান সমাজের কাছে অত্যন্ত শিক্ষণীয়। শচীমোহন অবশ্য বলেন, খুব বেশি কিছু তো করিনি। সমাজ ও মানুষের জন্য নিজের সামর্থ্যে কিছু করার চেষ্টা করেছি মাত্র। লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণের কাজ ছাড়াও বহু বছর ধরে এলাকার কচিকাঁচা থেকে যুবক-যুবতী, সকলকে বিনা খরচে নাচ, গান, আবৃত্তি শেখানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছেন তিনি। তাঁর কেন্দ্র থেকে অনেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে জাতীয় স্তরে সুনাম অর্জন করেছেন। নিরক্ষরদেরও বিশেষ পদ্ধতিতে কবিতা শেখানো হয় তাঁর সাহিত্য চর্চা কেন্দ্রে। অবসরজীবনে এখন তাঁর ধ্যানজ্ঞান মুক্তচিন্তার আরও সম্প্রসারণ। এ কাজে উত্তরবঙ্গে নীরব একক সাধক শচীমোহন, সকলের অনুপ্রেরণাও বটে।