ক্রিকেটের ঈশ্বর যেন হঠাৎই শয়তান

283

নিজস্ব প্রতিনিধি : তুমি আর ঈশ্বর নও। আজ থেকে তুমি এক স্বার্থান্বেষী মানুষ। ঈশ্বর কখনও এ রকম করেন না। তুমি আমার এত প্রিয় মানুষ কীভাবে এত ধান্দাবাজ হযে গেলে? আমার প্রিয়তম মানুষের তালিকা থেকে কেটেই দিলাম তোমার নাম।-টুইটার, ফেসবুক ভরে যাচ্ছে এ রকম বাক্যে। কাকে উদ্দেশ্য করে নয়াদিল্লি, মুম্বই, কলকাতা থেকে শুরু করে ছোট ছোট শহরের মানুষ ক্রোধের আগুন ছুড়ে দিচ্ছেন? অবাক করা নাম। ইনি শচীন তেন্ডুলকার। আজীবন সমস্ত ভারতীয়র প্রিয় মুখ হয়ে থাকা শচীন সম্ভবত জীবনে প্রথমবার ভারতে রীতিমতো খলনায়ক। টুইটারে বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার সারাদিন, দেশের অন্যতম ট্রেন্ড হ্যাশট্যাগে শেমঅনইউশচীন।

বালুরঘাটের মহাদ্যুতি অধিকারী যেমন লিখেছেন, আমার ছেলে যখন ক্রিকেট বুঝতে শিখবে, তাকে শচীনের খেলা দেখতে বলব। বলব, ইউটিউবে শারজার মরুঝড় দেখতে। চেন্নাইয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ইনিংসটা দেখতে। আমার ছেলে যখন আরও বড় হবে, তখন ওকে বোঝানোর চেষ্টা করব একটা জিনিস। শচীন বিশ্বের সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার হতে পারেন। কিন্তু ও কোনওমতেই এমন চরিত্র নন, যাকে রোল মডেল বলা যায়। বরং রোল মডেল নিযে প্রবন্ধ এলে মহম্মদ আলির নাম লেখা যেতে পারে।

- Advertisement -

রাতারাতি ভারতবাসীর অনেকের চোখে শচীন খলনায়ক হয়ে গিয়েছেন কৃষক আন্দোলন ঘিরে রিহানা, গ্রেটা থুনবার্গের টুইটের পর তেন্ডুলকার কেন্দ্রীয় সরকারের সমর্থনে পালটা টুইট করায়। তিনি লিখেছিলেন, ভারতের সার্বভৌমত্ব কিছুতেই ক্ষুণ্ণ করা যাবে না। বাইরে থেকে ভারতের নিজস্ব বিষয়ে মত দেওযা যাবে না। ভারতীযরা ভারতকে জানে এবং তারাই দেশের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন।

এতেই চটেছেন অজস্র নেটিজেন। তাঁরা অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, তেন্ডুলকার যা বলেছেন, তাতে তো আমেরিকায় ক্যাপিটল হিলের ঘটনা, মাযানমারে সেনাবাহিনীর অভ্যুত্থান নিযে ভারতীযরা কথা বলতে পারবেন না। তা হলে কি শচীন মতপ্রকাশের অধিকারই কেড়ে নেওয়ার পক্ষপাতী, যা আরএসএস বা মোদি সরকারের ভাবনার সঙ্গে মেলে? যে শচীন চিরকাল পাশের বাড়ির ছেলে হযে থেকেছেন ভারতীয়দের কাছে, অনেকে আদর্শ জামাই হিসেবে ভেবেছেন, তাঁর চকোলেট বয়ের ভাবমূর্তি নিমেষে খানখান হযে গিয়েছে। শারাপোভা একবার বলেছিলেন, শচীনকে তিনি চেনেন না। তখন যাঁরা শচীনের হযে গলা ফাটিয়েছিলেন, তাঁরাই এখন তাঁর বিরুদ্ধে সোচ্চার। অনেকে বলছেন, শারাপোভা ঠিকই করেছিলেন। শচীনকে আরএসএস ও বহুজাতিক সংস্থার দালালও বলেছেন অনেকে। শচীন এর আগে কোনও দিন রাজনৈতিক কথাবার্তা বলেননি কঙ্গনা রানাউতের স্টাইলে। এবার কেন বললেন, তা নিযে প্রশ্ন তুলেছেন বহু মানুষ। ক্ষোভ আরও বেড়েছে শচীনের পর সার দিযে অজস্র ক্রিকেটার সরকারের সমর্থনে নেমে পড়ায়। শচীনের সঙ্গে লিখেছেন কোহলি, রাহানে, রোহিত, শাস্ত্রী এমনকি কুম্বলেও। গণহারে ক্রিকেটারদের নেমে পড়া নিয়ে উড়ে আসছে নানা কটাক্ষ। শচীনকে তো বিশ্রী ভাষায আক্রমণ করা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ক্রিকেটার ইরফান পাঠানের টুইটটি আলাদা করে লেখার মতো। প্রাক্তন সতীর্থদের উলটো পথে হেঁটে তিনি লিখেছেন, আমেরিকায যখন জর্জ ফ্লয়েড পুলিশের হাতে খুন হয়েছিল, তখন ভারতীয়রা সঠিক ভাবেই তার প্রতিবাদ করেছেন। পুরোপুরি শচীনের উলটো সুর। অভিনেত্রী কঙ্কনা সেনশর্মা একজনের প্রশ্নের উত্তরে টুইটে লিখেছেন, আমার মনে হয়, কোনও ভয় থেকেই এক সুরে কথা বলছেন সবাই।  শচীনকে গালাগাল দেওযার পাশাপাশি ইতিহাস টেনে এনে পালটা অভিজাত বিদ্রুপ রয়েছে অনেক। ফেসবুকে অগ্নীশ্বর চক্রবর্তী যেমন লিখেছেন, বেঞ্জামিন হের্নিম্যান বোম্বে ক্রনিকলস পত্রিকার সাংবাদিক ছিলেন, জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের কথা আন্তর্জাতিক স্তরে ছড়িয়ে দেন। বিদেশি অবশ্যই। সেসময় ভারতের ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে দাঁড়ান পাতিয়ালা ক্রিকেট দলের প্রাক্তন ক্যাপ্টেন মহারাজা ভূপিন্দর সিং। একই সুরে, এটা দেশের নিজস্ব ব্যাপার- এই মর্মে। ট্র‌্যাডিশন আদতেই বহমান। জীবনে এই প্রথম দেশে চূড়ান্ত ধিক্কৃত শচীন তেন্ডুলকার কোথাও যেন পঞ্জাবের কৃষকদের আন্দোলনের সঙ্গে পঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগকে মিশিয়ে দিলেন।