প্রচারের আড়ালে সমাজসেবা করছেন সাধুরাম রায়

সুনীল রায়, বীরপাড়া : দেশের বিভিন্ন জায়গায় যখন অস্থিরতা এবং অবিশ্বাসের পরিবেশ বেড়ে চলেছে, তখন প্রচারের আড়ালে নিঃশব্দে সমাজসেবা করে চলেছেন ধনীরামপুরের ডুডুয়া নদীর সাধুরঘাটের সাধুরাম রায়। তাঁর নামেই ওই ঘাটের নামকরণ করা হয়েছে। শুখা মরশুমে বাঁশের সাঁকো বানিয়ে দেন। ভরা বর্ষায় নৌকো দিয়ে পারাপার করান। এক সময় চরম অর্থাভাবে থাকতে হলেও এখন তিন ছেলে সংসারের দায়িত্ব নিয়েছেন। পেশায় মাঝি সাধুরাম রায় বিনা পারিশ্রমিকে ধূপগুড়ি উচ্চবিদ্যালয়, ধূপগুড়ি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, সুকান্ত মহাবিদ্যালয়, পূর্ব মল্লিকপাড়া উচ্চবিদ্যালয় সহ বহু স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীকে রোজ তাঁর নৌকা করে ডুডুয়া নদী পারাপার করে দেন। প্রায় ৪৪ বছর ধরে এটাই তাঁর নিত্যদিনের রুটিন। একদিনের জন্যও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

বয়স ৭৩ ছুঁইছুঁই সাধুরাম রায় একসময়ে অভিনয়ের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। সবসময় হাসিখুশি এই মানুষটির মতে, বিনা পারিশ্রমিকে ছাত্রছাত্রী ও স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নৌকোয় করে পার করিয়ে তৃপ্তি মেলে। তিনি জানান, নিজে সেরকম লেখাপড়া জানেন না। কিন্তু ছেলেদের লেখাপড়া শেখাতে কোনো ত্রুটি রাখেননি। তিন ছেলেই কলেজের গণ্ডি পেরিয়েছেন।

- Advertisement -

ছেলেরা যখন ছোটো ছিল, তখন সামান্য জমিতে চাষাবাদ করার পাশাপাশি ডুডুয়া নদীতে নৌকোয় পারাপার করে কোনোরকমে সংসার চালাতেন। কিন্তু তখনও ছাত্রছাত্রী বা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কাছ থেকে পয়সা নেননি। এখন সেই অভাব আর নেই। তিনি বলেন, বাংলা ১৩৮১ সালে ধনীরামপুরের রাজকিশোর রায় আমাকে একটি নৌকা উপহার হিসেবে দেন। কিন্তু নৌকাঘাট পর্যন্ত যাওয়ার রাস্তা কোথায়? যেমন ভাবা তেমনি কাজ। নিজের সামান্য জমির ভেতর দিয়ে জনসাধারণের চলাচলের জন্য সাধুরাম রাস্তা তৈরি করলেন। নদীর অপর পাড়েও মন্টু সোম নামে এক ব্যক্তি নিজের জমিতে চলাচলের রাস্তা করে দেন। এজন্য কোনোরকম সাহায্য নেননি তাঁরা। অথচ এখন ঘাটটির কর বাবদ ধনীরামপুর-২ গ্রাম পঞ্চায়েতকে বার্ষিক পাঁচ হাজার টাকা দিতে হয়।

তিনি আরও বলেন, একটা সময় ছিল যখন গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ আর্থিকভাবে পিছিয়ে ছিলেন। তখন চাষাবাদ তেমন হত না। পাশাপাশি এলাকায় কাজও ছিল না। এছাড়া, যোগাযোগের অভাবে ভিনরাজ্যে গিয়ে কাজ করার মতো উপায়ও ছিল না। যাঁদের ঘরে নুন আনতে পানতা ফুরানোর অবস্থা, তাঁরা ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠানোর জন্য নৌকাভাড়া জোগাবেন কী করে? সাধুবাবুর মতে, ছাত্রছাত্রীরা দেশের ভবিষ্যৎ। তারা লেখাপড়া শিখে গ্রামের উন্নতি করলেই আমার এই শ্রম সার্থক হবে। এই ভাবনা নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের পারাপার করে চলেছি। যতদিন বাঁচব ততদিন এই কাজ করে যেতে চাই। এই ঘাট দিয়ে পারাপার করে পড়াশোনা করা অনেক ছাত্রছাত্রী আজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

ধূপগুড়ি সুকান্ত মহাবিদ্যালয়ের পড়ুয়া কৌশিক রায়, শ্যামল রায়, ভাগ্যলিপি রায়, তনুশ্রী রায়, মল্লিকপাড়া উচ্চবিদ্যালয়ের অনামিকা মুন্ডা, দীপক রায়দের কাছে সাধুরামবাবু প্রেরণাস্বরূপ। তাঁরা সকলেই একযোগে জানিয়েছে, তাঁর ঋণ শোধ হওয়ার নয়। স্কুলছাত্র ভগৎ রায় বলে, উনি আমাদের অভিভাবকের মতো পাশে থাকেন। প্রতিদিন গড়ে দেড়শো ছাত্রছাত্রী ছাড়াও শিক্ষক-শিক্ষিকারা ওঁর নৌকায় পারাপার করেন। কিন্তু আমাদের কাছ থেকে কখনও একপয়সা নেন না।

পূর্ব মল্লিকপাড়া উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ডঃ অমিতকুমার দে বলেন, সাধুরামবাবু সত্যিই অসাধারণ। আজকের দিনে এমন মানুষ পাওয়া যায় না। সব সময় হাসিখুশি থাকা মানুষটি নীরবে সমাজসেবা করে চলেছেন। ওঁর মতো মানুষ আছেন বলেই পৃথিবীতে অসহায়রা বেঁচে রয়েছেন।