দারিদ্র্যকে হারিয়ে সাহিদা কলেজে গেম টিচার

56

কৌশিক সরকার, দিনহাটা : বাবা দিনমজুর আর মা ভিক্ষাজীবী। এমন এক বাবা-মায়ের মেয়ে আজ আলিপুরদুয়ারের মহিলা কলেজে স্টেট এইডেড কলেজ টিচার। খেলা জীবনকে জেতার মন্ত্র শেখায়। সাহিদা বানুকেও যেমন শিখিয়েছে। জীবনে বহুবার হারতে হারতে এই মন্ত্রকেই হাতিয়ার করে শেষপর্যন্ত বাজিমাত করেছেন। রবিবার জাতীয় ক্রীড়া দিবস। দেশের ক্রীড়া সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের দিন। সাহিদার জীবন কাহিনী এই দিনটিকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেবেই দেবে।

দিনহাটা-১ ব্লকের প্রত্যন্ত গ্রাম বড় ফলিমারি। বিয়ের আগে সাহিদার মা আহেলা বিবি ভিক্ষাবৃত্তি করতেন। বাবা জহির আলি অন্যের বাড়িতে থাকতেন আর মজুর হিসাবে কাজ করতেন। বিয়ের পর রেলের জমিতে একটি কুঠুরিতে তাঁদের ঘর বাঁধা। হাজার ফুটোর পাটকাঠির বেড়া, তার ওপরে প্লাস্টিকের ছাউনি দেওয়া ঘরে রোদবৃষ্টির অবাধ যাতায়াত। এই ঘরেই দাদার পর বোন সাহিদার জন্ম। সংসার চালাতে বাবার সম্বল তখন একটি ভ্যানরিকশা। দিনান্তে সামান্য  উপার্জন। মাথায় সারাক্ষণই সংসার চালানোর দুশ্চিন্তা। ঘরের পাশেই রেল ময়দান। খেলা শুরু হলেই জহির আলির ছোট্ট মেয়েটার বারেবারে সেখানে ছুট। তা প্রশিক্ষক অজিতচন্দ্র বর্মনের দৃষ্টি এড়ায়নি। তিনিই সাহিদার প্রথম কোচ। এভাবেই সাহিদার প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে ওকড়াবাড়ি উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি হওয়া। পাটকাঠির বেড়া দেওয়া ঘরটি খেলাধুলোয় মেলা পুরস্কারে ভরে উঠতে শুরু করে। খোখো-তে বাংলার প্রতিনিধিত্ব করে জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণের সুযোগ মেলে। হাইজাম্প, লংজাম্প, যুব উৎসবের মতো অনেক কিছুতেই রাজ্যস্তরে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ আসে। কিন্তু আর্থিক প্রতিকূলতা বাধ সাধে। বহুবার সুযোগ হারানোর পরিস্থিতি হলেও অজিতবাবু সহ বেশ কয়েকজন সহৃদয় মানুষের আর্থিক সাহায্যে মুশকিল আসান। প্রায় প্রতিটি প্রতিযোগিতাতে পুরস্কার। ১৪ বার খোখোর জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় বাংলার প্রতিনিধিত্ব।

- Advertisement -

এসবের মধ্যেই বহুবার বাবা-মায়ের কাছে মেয়ের বিয়ের জন্য প্রস্তাব। কিন্তু সাহিদার তো বিয়েতে না। শুনতে বাধ্য হন বাবা-মা। বিনিময়ে সবার কাছে কম কটূক্তি শুনতে হয়নি। পরিবার অবশ্য সাহিদাকে প্রতিষ্ঠা করতে কোনও খামতি রাখেনি। বোনের পড়াশোনার খরচ চালানোর জন্য দাদা একসময় কলেজের পড়াশোনা ছাড়েন। দিনমজুরির কাজে বাবাকে নিয়ে ভিনরাজ্যে পাড়ি। সাহিদা পরিবারের এই ত্যাগকে যথাযোগ্য সম্মান দিয়েছেন। ময়নাগুড়ি কলেজ থেকে বিএ, দিনহাটা মহিলা শারীরশিক্ষা মহাবিদ্যালয় থেকে বিপিএড এবং শেষে কলকাতার হেস্টিংস হাউস থেকে এমপিএড। অধ্যাপক পিন্টু শীল, শিক্ষক বিশ্বনাথ দেব সহ অনেকেই তাঁকে যথাযোগ্য সহযোগিতা করেছেন। এমপিএড করার পরের বছর আলিপুরদুয়ারের মহিলা কলেজে শারীরশিক্ষা বিভাগে অতিথি শিক্ষক হিসেবে যোগদান। বর্তমানে স্টেট এইডেড কলেজ টিচার হিসাবে সেখানে কাজ করছেন।

জহির-আহেলা খুবই খুশি। জহির বলছেন, মেয়ের জন্য এখন আর ভ্যানরিকশা টানতে হয় না। দুবেলা খাবারের চিন্তাও করতে হয় না বলে আহেলা জানান। দাদা আলি হোসেনের কথায়, বোনের জন্যই আমরা একটু সুখের মুখ দেখেছি।

সাহিদার  উপার্জনে বাড়ির চেহারা বদলেছে। এবার তাঁর লক্ষ্য পিএইচডি ডিগ্রি। দুঃস্থ পরিবারের প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের পাশে আজীবন থাকতে চান। শিষ্যাগর্বে গর্বিত তাঁর প্রথম কোচ অজিতবাবু বলছেন, ছোটবেলা থেকেই ওর একাগ্রতা, শেখার প্রবল ইচ্ছে, বড়দের প্রতি সম্মান, হার না মানার মানসিকতা আজ ওকে এই জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে।