মহম্মদ হাসিম : হাজার হোক জামাই বলে কথা! তাই শ্বশুরবাড়ির জন্য কিছু না করলে চলে? আমেরিকার কৃষক পরিবারের ছেলে স্যামুয়েল ওভেন্স ফুজ এমনটাই ভেবেছিলেন। সেই ভাবনারই সূত্রে খড়িবাড়ির বুড়াগঞ্জ গ্রাম পঞ্চায়েতের ডাকুয়াজোতে ইউসিসি বনাঞ্চলের পাশে আদিবাসী কৃষকদের নিয়ে তাঁর কৃষিকাজের শুরু। প্রায় সাত বিঘা জমিতে ফলাচ্ছেন আপেল, পেয়ারা, কাজুবাদাম। আম ফলাচ্ছেন প্রায় আট রকমের। সমস্তটাই জৈব সারে। সাহেব জামাই তাঁর এহেন কর্মকাণ্ডের সুবাদে এলাকার আট আদিবাসী কৃষকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আধুনিক পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের উন্নত কৃষিকাজের জন্য উপযুক্ত করে গড়েও তুলছেন। নীরবে চললেও স্যামুয়েলের এই কর্মকাণ্ড এলাকায় প্রচুর প্রশংসা কুড়োচ্ছে।

নাগাল্যান্ডের পাট চুকিযে জারিনী ইজংরা বাগডোগরায় বাড়ি বানিয়েছেন। অনাথদের নিযে সমাজসেবার কাজে যুক্ত। এই সূত্রেই একবার নেপালে পাড়ি দেওয়া। আমেরিকার উত্তর ক্যারোলিনার বাসিন্দা স্যামুয়েলের সঙ্গে জারিনীর আলাপ সেখানেই। সেই পরিচিতি থেকে প্রেম আর পরবর্তীতে পরিণয়। বিয়ের পর স্যামুয়েলের বাগডোগরায় আসা। কৃষক পরিবারের ছেলে হওয়ায় কৃষিকাজ তাঁর রক্তে। পাশাপাশি, সাত বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃষিকাজ নিয়ে গবেষণার সুবাদে নিজের জ্ঞানের পরিধিটা আরও বাড়িয়েছেন। উত্তরবঙ্গে এসে অবশ্য রাসায়নিক সারে সর্বত্র কৃষিকাজ চলতে দেখে স্যামুয়েল খুবই অবাক হন। এই রাসায়নিক সারে চাষবাসে কতটা ক্ষতি হয় তা আজকাল মোটামুটিভাবে সবারই জানা। অতিরিক্ত মাত্রায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের জেরে নেপাল কিছুদিন ভারতীয় সবজি আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। পাশাপাশি, রাসায়নিক সারে চাষবাস সংক্রান্ত সমস্যা মেটাতে নেপালের পাশাপাশি সিকিমও ইতিমধ্যেই জৈবসারে চাষবাসে জোর দিয়েছে। তাই স্যামুয়েল এখানে সবাইকে জৈবসারের বিষযে জানাবেন বলে ঠিক করেন। ২০১৬ সালে ডাকুয়াজোতে স্ত্রীর নামে জমি কিনে চাষবাসের পরিকল্পনা নেন। এনিযে প্রথমদিকে কিছুটা সমস্যা হলেও পরে অবশ্য সবকিছু কেটে যায়। চলতি বছরের ফেব্রুযারি থেকে এলাকার কৃষকদের নিয়ে স্যামুয়েল এখানে কৃষিকাজ শুরু করেছেন। স্বামী-স্ত্রী বছরের ছয় মাস আমেরিকায় থাকেন আর ছয় মাস এখানে। যতদিন এখানে থাকেন ততদিন কৃষিকাজের মাধ্যমেই স্যামুয়েল এলাকায় সমাজসেবার চেষ্টা চালান।

স্বভাবলাজুক যুবকের কথায়, আন্তর্জাতিক বাজারে জৈবসারে উত্পাদিত ফসলের চাহিদা অনেকটাই। তাই কৃষকরা যতটা এই চাষে সড়গড় হবেন, উপকৃত হবেন ততটাই। এলাকার কৃষকদের উন্নয়নে স্যামুয়েল ভবিষ্যতে এখানে একটি কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে চান। যাঁদের নিয়ে উত্তরবঙ্গের এই সাহেব জামাই তাঁর এই কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন, তাঁদের অন্যতম খোপন মুণ্ডা বলছেন, রোজকার কৃষিকাজ যে কতটা বদলে গিয়ে আধুনিক হয়ে উঠেছে তা স্যামুয়েলের সঙ্গে দেখা না হলে জানতেই পারতাম না।