দোতারাই সঙ্গী, প্রদীপ জ্বেলে দোকানে চা বেচেন সন্তোষ

75

সুকুমার বাড়ই, রায়গঞ্জ : দূর থেকে ভেসে আসছে দোতারার মেঠো সুর। অন্ধকারে জ্বলছে কেরোসিনের প্রদীপ। কাছে যেতে দেখা গেল চায়ের দোকানদার সন্তোষ দেবনাথ দোতারা বাজিয়ে গান ধরেছেন, তোমায় হৃদমাঝারে রাখিব ছেড়ে দেব না! দোকানে তখন খদ্দের নেই। গানের ফাঁকে আলাপ জমে। দেশভাগের দগদগে ঘা এখনও সন্তোষের মন থেকে শুকোয়নি। পূর্ববঙ্গের ময়মনসিংহ ছিল তাঁর আদি বাড়ি। সেই ছোটবেলায় মা, বাবাকে হারিয়েছেন। তারপর পাড়ি দেন এ দেশে। প্রায় ৪৯ বছর আগে। রায়গঞ্জের পাশেই ছত্রপুরে তখন রিফিউজিদের কলোনি। গিজগিজ করছে ছোট ছোট ঘরে শরণার্থীরা। সেখানেই বড় দাদার একটি ছোট্ট ঘরে ঠাঁই মেলে সন্তোষের। দাদার আশ্রয়ে থেকে ছোটবেলা থেকেই এ কাজ, সে কাজ করতে থাকেন।

শেষে পশ্চিম উদয়পুরে কুলিক নদীর পাড়ে কোনওমতে নিজের একটা মাথা গোঁজার জায়গা করেছেন তিনি। সন্তোষ দেবনাথের বয়স এখন ষাট ছুঁই ছুঁই। স্ত্রী, পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলে। কখনও অন্যের জমিতে কাজ করে, কখনও মিষ্টির দোকানে কাজ করে সংসারের হাল ধরেছেন সন্তোষ দেবনাথ। এরই মধ্যে চার মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে এখন রংয়ের কাজ করে। ছোট মেয়ে পড়ে ক্লাস নাইনে।

- Advertisement -

নানান রকমের কাজ করতে করতে শেষমেশ সন্তোষ নিজেই একটি ছোটখাটো চায়ের দোকান পেতেছেন চণ্ডীতলা বাজারের উত্তর দিকে রাস্তার পুব পাশে ফুটপাথের ধারে। প্রায় ২৩ বছর ধরে চলছে দোকান। কয়েকটি থালা, গ্লাস, একটি কেটলি, দুটি কৌটো, একটি হাতা, একটি গামলা, আর উনুন তাঁর সম্বল। দুটো বয়ামে বিস্কুট রয়েছে। টোটোচালক, ভ্যানচালক, বাজারে আসা সবজি বিক্রেতা সহ কিছু বয়স্ক মানুষ তাঁর দোকানে নিয়মিত চা খান।

সন্তোষ বলতে থাকেন, সকালে মোটামুটি ভালোই বিক্রি হয়। তবে করোনার জন্য খরিদ্দার কম আসছে। সন্ধ্যায় তেমন বেচাকেনা নাই। তবুও দোকান তো খুলতেই হয়। সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে দোতারাটা হাতে নিয়ে বলতে থাকেন, অবসর সময়ে কী করব, বহুদিনের পুরোনো দোতারার দিকে চোখ পড়ে যায়। ২৫ বছর আগের কেনা। ঝাড়ফুঁক  করে নতুন তার লাগিয়ে শুরু করলাম অভ্যাস।

কথায় কথায় জানা গেল, গুরুও জুটে যায় তাঁর। পাশের গ্রাম উদয়পুর। সেখানে ধীরেন বর্মনের কাছে নিয়মিত তালিম নিয়ে এখন তিনি বেশ বাজাতে ও গাইতে পারেন। অবসরে দোকানে বসে দোতারা বাজনার সঙ্গে সঙ্গে লোকগানের সুর ভাঁজেন। কোনও কোনও খদ্দেরের আবদারও সামলাতে হয়। মাঝে মাঝে হরিনাম কীর্তনের দলেও ডাক পড়ে। অনেক নেই-এর মধ্যেও সন্তোষ দেবনাথের মুখে আছে সবসময়ে হাসি। গান গাইতে গাইতে বলেন, সেই ছোটবেলা থেকে দুখের নদীতে ভেসে চলছি। তাই দোতারার সুরে আনন্দ খুঁজি। খরিদ্দার না থাকলে বাউল গানে মন মজাই।