ডোকালামে অবস্থান জোরালো করছে চিন, উদ্বেগ বাড়ছে ভারতের

387

নয়াদিল্লি ও গ্যাংটক :  প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় সমস্যা নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা এখনও জারি। এর মধ্যে  ফের মাথাচড়া দিল ডোকালাম ক্ষত। ডোকালামের কাছে ভুটানের মধ্যে একটা আস্ত গ্রাম বানিয়েছে চিন, আগেই তা জানা গিয়েছিল। এবার চিনের বানানো রাস্তার ছবি উপগ্রহ চিত্রে ধরা পড়ল। যা যথেষ্ট চিন্তার বিষয়। ফলে ফের ডোকালাম ক্ষত আবার জেগে উঠেছে বলে মনে করা হয়েছে। ২০১৭ সাল। ডোকালামে ৭৩ দিন ধরে মুখোমুখি অবস্থান করেছিল ভারতীয় ও চিনা সেনা। শেষপর্যন্ত দুদেশ বিতর্কিত এলাকা থেকে বাহিনী সরিয়ে নেয়। তবে কিছুদিন পর থেকে ভারত-ভুটান-চিন সীমান্তবর্তী ডোকালামে ফের গণমুক্তি ফৌজের আনাগোনা বেড়েছে বলে বিভিন্ন মাধ্যমে দাবি করা হচ্ছিল। সম্প্রতি প্রকাশিত উপগ্রহ চিত্র থেকে ভুটানের অধীনে থাকা ডোকালাম মালভূমিতে চিনা অনুপ্রবেশের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। উপগ্রহ চিত্রে দেখা গিয়েছে, ডোকালামে শুধু চিনা সেনা টহলদারি বাড়ায়নি। তারা সেখানে স্থায়ী পরিকাঠামো তৈরি করেছে। কয়েকদিন আগে ভুটানের এলাকা দখল করে চিনের গ্রাম তৈরির ঘটনা সামনে এসেছে। ভারতে ভুটানের রাষ্ট্রদূত অবশ্য এধরনের কোনও ঘটনার কথা অস্বীকার করেছেন। তবে ডোকালামে চিনা বাহিনীর উপস্থিতির প্রমাণ যথেষ্ট জোরাল।

উপগ্রহ চিত্র অনুযায়ী, ডোকালামের জাম্পেলরি রিজ এলাকায় ভুটানের অন্তত ৯ কিলোমিটার ভিতরে ঢুকে চিন রাস্তা তৈরি করেছে। রাস্তাটি এসেছে ত্রিদেশীয় সীমান্তের সেই পয়েন্ট পর্যন্ত যেখানে ৩ বছর আগে ভারতীয় বাহিনী চিনা জওয়ানদের পথ আটকে ছিল। সেবারও এই রাস্তা তৈরিকে কেন্দ্র করেই গোলমালের সূত্রপাত হয়। নিজেদের এলাকায় চিনের রাস্তা তৈরির বিরোধিতা করেছিল ভুটান। ভুটানের সমর্থনে বাহিনী পাঠায় ভারত। ভারতীয় জওয়ানরা চিনের সড়ক নির্মাণকারী শ্রমিক ও বুলডোজারকে ফেরত যেতে বাধ্য করেন। ওই সময় একাধিকবার ভারতীয় ও চিনা জওয়ানদের মধ্যে হাতাহাতি হয়। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা জুড়ে উত্তেজনা ছড়ায়। লাদাখের প্যাংগং লেকেও দুই বাহিনীর মধ্যে পাথর ছোড়ার ঘটনা সামনে আসে। পরে অবশ্য ভারত ও চিনের শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছিল।

- Advertisement -

চিন যে ডোকালামকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা জিইয়ে রাখতে চাইছে তা ঘটনা পরম্পরায় স্পষ্ট। ভারতীয় প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, গালওয়ানে সংঘর্ষের অনেক আগে থেকে এলএসি জুড়ে চাপ সৃষ্টির কৌশল নিয়েছে চিন। এজন্য তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকাকে বেছে নিয়েছে। এর মধ্যে আছে পূর্ব লাদাখের গালওয়ান উপত্যকা ও প্যাংগং লেক, হিমাচলপ্রদেশের কৌরিক পাস ও সিকিম সীমান্তবর্তী ডোকালাম অঞ্চল। ভুটানের এলাকা হলেও চিন আদতে ভারতের দিকে লক্ষ্য রেখে সেখানে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে। ডোকালাম থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডরে  পৌঁছোনো সহজ। ভারতকে চাপে রাখতে তাই ডোকালামকে হাতিয়ার করতে চাইছে চিন।

পর্যবেক্ষকদের বক্তব্য, ২০১৭-তে ভারতের কাছে অপ্রত্যাশিতভাবে বাধা পেয়েছিল চিন। ভারতের চাপের সামনে শেষপর্যন্ত তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল। এর প্রধান কারণ, সংলগ্ন চিনা ঘাঁটিগুলি থেকে ডোকালামে যাতায়াতে সমস্যা। সেসময় চিনা জওয়ানদের কয়েক কিলোমিটার হেঁটে ত্রিদেশীয় সীমান্ত পয়েন্টে আসতে হত। তুলনায় অনেক তাড়াতাড়ি সেখানে পৌঁছোতে পারতেন ভারতীয় জওয়ানরা। সিকিম থেকে ডোকালামের উঁচু এলাকায় অবস্থানকারী ভারতীয় জওয়ানদের কাছে রসদ পৌঁছোনো যেত সহজে। অন্যদিকে, ডোকালাম মালভূমিতে ঘাঁটি গেড়ে থাকা চিনা বাহিনীর জন্য হাঁটাপথে খাবার পৌঁছোতে হচ্ছিল। সেই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে চাইছে চিন। ডোকালামে যে রাস্তাটি তারা তৈরি করেছে সেখানে রসদবাহী ভারী ট্রাক অনায়াসে যাতায়াত করতে পারবে। এর সাহায্যে সংলগ্ন ঘাঁটিগুলি থেকে চিনের বাহিনী বড় সংখ্যায় খুব সহজে ডোকালামে ঢুকে পড়তে পারে। পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে ভারত। পূর্ব লাদাখকে কেন্দ্র করে দুদেশের মধ্যে উত্তেজনার পারদ যেভাবে চড়ছে, তাতে ডোকালাম সংকট নতুন মাত্রা যোগ করছে বলে মনে করা হচ্ছে।