স্ক্র‌্যাপ বিক্রিতে দুর্নীতি পুরসভায়, কোচবিহারে তদন্তে পিকের টিম

314

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, কোচবিহার :  কোচবিহার পুরসভার স্ক্র‌্যাপ বিক্রি নিয়ে লক্ষ, লক্ষ টাকা দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত শুরু করল পিকের টিম। কোনওরকম সরকারি নিয়ম না মেনেই মাত্র ৬ লক্ষ ৫ হাজার টাকায় স্ক্র‌্যাপগুলি বিক্রি করে দেওয়া হয়। বিরোধীদের অভিযোগ, বেনামে পুরসভা থেকে স্ক্র‌্যাপগুলি কেনা হয়েছিল। তারপর কয়েকগুণ বেশি দামে সেগুলি অন্যত্র বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। তৃণমূল সূত্রের খবর, কিছুদিন আগেই স্ক্র‌্যাপ বিক্রি নিয়ে অভিযোগ যায় পিকের টিমের কাছে। তার তদন্ত করতে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ হয়েছে তদন্তকারী টিমের। যেদিন পুরসভার বোর্ড মিটিংয়ে স্ক্র‌্যাপ বিক্রির সিদ্ধান্ত হয়, সেদিনই স্ক্র‌্যাপ কেনার জন্য পুরসভায় চেক জমা দেন কোচবিহারের এক মোটর গ্যারাজ মালিক। আবার চেক ক্লিয়ারেন্সের পর পুরসভার অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হওয়ার আগেই যাবতীয় স্ক্র‌্যাপ পুরসভার গুদাম থেকে বের করেও নিয়ে যাওয়া হয়।

পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, ভূষণ সিং চেয়ারম্যান হওয়ার পর ২০১৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পুরসভার সাধারণ সভায় সিদ্ধান্ত হয়, পুরসভার গুদামঘরে যে সমস্ত স্ক্র‌্যাপ আছে, সেগুলি বিক্রি করা হবে। তার জন্য একটি কমিটি গঠন করারও লিখিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল ওই সভায়। পুরসভার উচ্চপদস্থ একাধিক আধিকারিক জানিয়েছেন, কোন কোন স্ক্র‌্যাপ বিক্রি হবে, যেগুলিকে স্ক্র‌্যাপ বলা হচ্ছে সেগুলি আদৌ স্ক্র‌্যাপ কি না, সমস্ত কিছু খতিয়ে দেখে বিক্রির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কমিটি। কোন পদ্ধতিতে স্ক্র‌্যাপ বিক্রি করা হবে সে বিষয়ে কমিটি পরামর্শ দেবে। তারপর সরকারি নিয়ম অনুসারে গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে টেন্ডার করে তবেই বিক্রি করা যাবে স্ক্র‌্যাপ। তবে ওইসব নিয়মের একটিও না মেনে স্ক্র‌্যাপগুলি বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।

- Advertisement -

অনু ওয়েল্ডিং ওয়ার্কস নামে একটি সংস্থা স্ক্র‌্যাবগুলি কিনেছে বলে জানিয়েছে পুর কর্তৃপক্ষ। বাস্তবে অনু ওয়েল্ডিং ওয়ার্কস শহরের কামেশ্বরী রোডে অবস্থিত একটি গ্যারাজ। সেখানে গাড়ি, ট্রাক সারাই  করা হয়। বিস্ময়কর বিষয় হল, যেদিন পুরসভার সাধারণ সভায় স্ক্র‌্যাপ বিক্রির সিদ্ধান্ত হয়, সেই দিনই সেগুলি কেনার জন্য পুরসভার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে চেক জমা করেন সংশ্লিষ্ট গ্যারাজের মালিক অনুপকুমার সাহা (অ্যাকাউন্ট নম্বর- ০৬৭০০৫০০০০৬৫, চেক নম্বর- ০০০৫৮১, তারিখ- ২৩/০৯/২০১৭)। যেদিন সাধারণ সভা হয় সেদিন ছিল শনিবার। পুরসভার একাধিক কাউন্সিলার জানিয়েছেন, বেলা ১২টা নাগাদ সভা শুরু হয়েছিল। চলেছিল প্রায় সন্ধ্যা পর্যন্ত। তবে কি সভা শেষ হওয়ার আগেই পুরসভায় স্ক্র‌্যাপ কেনার জন্য টাকা জমা পড়ে গিয়েছিল? কীসের ভিত্তিতে অনুপকুমার সাহা পুরসভায় টাকা জমা দিলেন?  ৬ লক্ষ ৫ হাজার টাকায় স্ক্র‌্যাপগুলি যে বিক্রি করা হবে সেটাই বা কে ঠিক করল?  এইসব প্রশ্নের কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি চেয়ারম্যানের কাছ থেকে।

বিক্রি করে দেওয়া স্ক্র‌্যাপগুলির মধ্যে একটি আর্থমুভার ছিল বলে জানা গিয়েছে। যা নিয়ে আরও বেশি করে জলঘোলা শুরু হয়েছে। বিরোধী কাউন্সিলারদের অভিযোগ, সামান্য যান্ত্রিক গোলযোগ থাকায় মেশিনটি ফেলে রাখা হয়েছিল। অল্প কিছু টাকা খরচ করলেই মেশিনটি সচল করা যেত। তা না করে বিশাল আকৃতির সেই মেশিনটি খণ্ড খণ্ড করে স্ক্র‌্যাপ হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। পুরসভার এক আধিকারিক জানিয়েছেন, কোনও যন্ত্রকে অকেজো হিসেবে চিহ্নিত করা বা স্ক্র‌্যাপ হিসাবে বিক্রি করে দেওয়ার জন্য সিলমোহর দিতে পারে একমাত্র বিশেষজ্ঞ কমিটি। কোনও বিশেষজ্ঞ কমিটি বা পুরসভার ইঞ্জিনিয়ার আর্থমুভারটি স্ক্র‌্যাপ হিসেবে বিক্রি করার কথা লিখিতভাবে জানাননি। তাহলে কোন রিপোর্টের ভিত্তিতে মেশিনটি বিক্রি করে দেওয়া হল তারও কোনও উত্তর পাওয়া য়ায়নি।

স্ক্র‌্যাপ বিক্রি নিয়ে ওঠা কোনও প্রশ্নেরই সোজাসুজি উত্তর দেননি পুর চেয়ারম্যান ভূষণ সিং। তিনি বলেন, বিক্রির বিষয়টি দেখভালের জন্য কমিটি তৈরি হয়েছিল এবং কোটেশনের মাধ্যমে সেগুলো বিক্রি হয়েছে। যদিও কবে পুরসভা কমিটি গঠন করেছিল, কারা সেই কমিটিতে ছিলেন, কতজন, কবে কোটেশন জমা দিয়েছিলেন, এইসব প্রশ্নের উত্তর তিনি এড়িয়ে যান। চেয়ারম্যানের বক্তব্য মানতে চাননি পুরসভার বিরোধী দলনেতা মহানন্দ সাহা। তিনি বলেন, স্ক্র‌্যাপ বিক্রি, চিহ্নিতকরণ কোনও ক্ষেত্রেই কোনওরকম সরকারি নিয়ম মানা হয়নি। সাধারণ সভায় গৃহীত কোনও সিদ্ধান্ত মানা হয়নি। চেয়ারম্যান ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্ক্র‌্যাপগুলি বিক্রি করে দিয়েছেন। আমরা বারবার প্রশ্ন করেও উত্তর পাইনি। গোটা বিষয়টি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দাবি করছি।