এনবিইউ-তে প্রতারণাচক্র, উপাচার্যের ভূমিকায় প্রশ্ন

25

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : আধিকারিক পরিচয়ে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের জলপাইগুড়ি ক্যাম্পাসকে ঘাঁটি করে লক্ষ-লক্ষ টাকা প্রতারণার ঘটনা প্রকাশ্যে এল। প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের জলপাইগুড়ি ক্যাম্পাসের চতুর্থ শ্রেণির অস্থায়ী কর্মী রনি দত্তের বিরুদ্ধে। রনি তৃণমূলের সক্রিয় কর্মী। তাঁর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও কয়েকজন জড়িত রয়েছেন বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। ঘটনার তদন্তে দুই সদস্যের বিশেষ কমিটি তৈরি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তদন্ত কমিটির সদস্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি ফিন্যান্স অফিসার সুরজিৎ দাস বলেন, তদন্ত প্রক্রিয়া চলছে। তাই ওই বিষয়ে এখনই কিছু বলা যাবে না। এখনও রিপোর্ট জমা দিইনি। রিপোর্ট পেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যা পদক্ষেপ করার করবে।

একটি বেসরকারি সংস্থার কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে দুটি ল্যাপটপ, মোবাইল সেট সহ প্রায় ৭ লক্ষ টাকার বহুমূল্য দ্রব্য নিয়ে বাইরে বিক্রি করে দিয়েছেন অভিযুক্ত কর্মী। অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অর্ডার পাইয়ে দেওয়ার জন্য নগদ ১ লক্ষ টাকাও নিয়েছেন রনি। শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রুপ সি পদে ওই বেসরকারি সংস্থার এক মালিকের স্ত্রীকে স্থায়ী চাকরি দেওয়ার নামে ৪ লক্ষ টাকা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে রনির বিরুদ্ধে।

- Advertisement -

বেসরকারি সংস্থাটির অন্যতম মালিক মহম্মদ রাজু জানিয়েছেন, তাঁরা সরকারি, বেসরকারি সংস্থায় প্রয়োজন অনুসারে বিভিন্ন ধরনের সামগ্রী সরবরাহ করেন। সেই সূত্রেই তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের জলপাইগুড়ি ক্যাম্পাসে গিয়েছিলেন। সেখানেই রনির সঙ্গে তাঁদের পরিচয় হয়। নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আধিকারিক পরিচয় দিয়ে কাজ পাইয়ে দেবেন বলে রনি টাকা নেন। বিভিন্ন সময় সামগ্রীর অর্ডারও দেন। সেইমতো ২০১৯ সালের শুরু থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত দফায় দফায় সামগ্রী সরবরাহও করেন তাঁরা। সেইসব সামগ্রী ক্যাম্পাসের একটি ঘরে পৌঁছে দেন সংস্থার কর্মীরা। তাঁদেরকে প্রাপ্তিস্বীকারের কাগজও দেওয়া হয়।

রাজুর বাড়ি শিলিগুড়ির ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ডাঙ্গিপাড়ায়। ফার্মের অন্য মালিকের বাড়ি রায়গঞ্জে। রাজু জানান, তাঁর সহযোগীর স্ত্রীকে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার জন্য মোট ৮ লক্ষ টাকায় চুক্তি করেছিলেন রনি। অগ্রিম হিসাবে ৪ লক্ষ টাকা দেন তাঁরা। তার মধ্যে ১ লক্ষ ৯০ হাজার টাকা ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে অভিযুক্তের আত্মীয়ের অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়া হয়।

রাজু বলেন, বারবার বিল জমা দিলেও টাকা না পাওয়ায় সন্দেহ হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসে গিয়ে খোঁজখবর করে জানতে পারি, আমরা প্রতারিত হয়েছি। আমাদের সরবরাহ করা সামগ্রী আদতে কর্তৃপক্ষের কাছে যায়ইনি। যাবতীয় প্রমাণ সহ লিখিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সবটা জানিয়েছি। তদন্ত কমিটিকেও সবকিছু বলেছি। ক্যাম্পাসের ঘরের ভেতরে সামগ্রী পৌঁছে দিয়ে আসতাম আমরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে এত বড় প্রতারণাচক্র রয়েছে কল্পনাও করতে পারিনি।

তবে ইতিমধ্যেই ঘটনা ধামাচাপা দিতে তৎপর হয়েছেন খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সুবীরেশ ভট্টাচার্য। বিষয়টি জানাজানি হোক সেটা চাইছেন না তিনি। গোটা ঘটনায় উপাচার্যের ভূমিকা নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন উঠেছে। এত বড় ঘটনা ঘটেছে, তদন্ত শুরু হয়েছে অথচ বিস্ময়করভাবে উপাচার্যের দাবি, তিনি নাকি কিছুই জানেন না।

সুবীরেশবাবু বলেন, বিষয়টি আমার কাছে আসেইনি। আমার কিছুই জানা নেই। যদিও উপাচার্যের এই দাবি মানতে নারাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা আধিকারিকদের একটা বড় অংশই। এক শিক্ষক বলেন, ক্যাম্পাসে পান থেকে চুন খসলে উপাচার্যের কাছে খবর পৌঁছে যায় আর এত বড় ঘটনা তিনি জানেন না, এটা হাস্যকর। অভিযুক্ত তৃণমূল কর্মী বলেই কি বিষয়টি ধাপাচাপা দিতে চাইছেন উপাচার্য? নাকি অন্য কোনও গোপন কারণ রয়েছে? এই প্রশ্নগুলোই এখন ক্যাম্পাসজুড়ে ঘুরছে।

জলপাইগুড়ি ক্যাম্পাসের দায়িত্বে থাকা অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার শুভজিৎ সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দিনের পর দিন ক্যাম্পাসে বসে থেকে একজন প্রতারণার কারবার চালিয়ে গেল অথচ তিনি কিছুই জানলেন না সেটা মানতে চাইছেন না কর্মীদের একাংশ। যদিও ওই বিষয়ে কোনও কথা বলতে চাননি শুভজিৎবাবু। কর্তৃপক্ষের তরফে তাঁকে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে বলেই দাবি করেছেন তিনি।

অভিযুক্ত রনি শিলিগুড়ি পুরনিগমের ২২ নম্বর ওয়ার্ডে থাকতেন। তাঁর ফেসবুক প্রোফাইলে জ্বলজ্বল করছে তৃণমূলের বিভিন্ন সভায় একাধিক বড় নেতার সঙ্গে ছবি। তৃণমূলের নাম ভাঙিয়ে ক্যাম্পাসে প্রভাব খাটানোর অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে বসে একজন অস্থায়ী চতুর্থ শ্রেণির কর্মীর পক্ষে একা প্রতারণার কারবার চালানো সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন শিক্ষক ও আধিকারিকদের একাংশ।

অভিযুক্ত রনি কোথায় আছেন সেটা কেউই বলতে পারছেন না। তাঁর একাধিক মোবাইল নম্বরে বারবার চেষ্টা করলেও প্রতিটি নম্বর বন্ধ বলেছে। মেসেজ করলেও উত্তর মেলেনি।

দার্জিলিং জেলা তৃণমূলের চেয়ারম্যান অলোক চক্রবর্তী বলেন, বিষয়টি জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখব। তবে দল কোনও অনৈতিক কাজকে সমর্থন করে না। দলের কেউ যুক্ত থাকলে কড়া পদক্ষেপ করা হবে।