মাটির তলায় ভাঁড়ার, বোকা বনছে হাতিরা

শুভজিৎ দত্ত, নাগরাকাটা : নিজেদের খাসতালুকে বেআকুব বনে যাচ্ছে হাতিরা। এক গুপ্তকক্ষ তৈরি করে প্রত্যন্ত বামনডাঙ্গা চা বাগানের প্রাথমিক স্কুল হাতি মোকাবিলায় নতুন দিশা দেখাচ্ছে। কোনো কারিগরি কৌশল নয়, নয় কোনো অস্ত্রের ব্যবহার। মিড-ডে মিলের আনাজপাতি রাখতে একটি আন্ডার গ্রাউন্ড গোডাউন তৈরি করাতেই কেল্লাফতে! এই গোডাউন তৈরির ছবছরের মধ্যে ওই স্কুলে হাতির হামলার কোনো ঘটনা ঘটেনি। কারণ, স্কুলের ওই গুপ্তকক্ষের এখনও খোঁজ পায়নি হস্তীকুল। অথচ স্কুলের ঢিলছোড়া দূরত্বে একপাশে গরুমারা ও অন্য পাশে ডায়নার জঙ্গলঘেরা বামনডাঙ্গায় দিনদুপুরেও হাতির পাল ঘুরে বেড়ায়। বিষয়টি যে স্কুলবাড়িতে হাতির হামলা ঠেকাতে মডেল হয়ে উঠতে পারে, মানছেন ব্লক প্রশাসনের কর্তারা। একই মত শিক্ষা দপ্তরের কর্তাদেরও।

নাগরাকাটা থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে বিছলাইন নামে একটি শ্রমিক মহল্লায় বামনডাঙ্গা টিজি প্রাথমিক স্কুল। একটা সময় সেখানে হাতির হামলা প্রায় রোজকার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যা নিয়ে জেরবার হয়ে যেত স্কুল কর্তৃপক্ষ। মিড-ডে মিলের চাল, ডালের লোভে টানা সাতদিন ধরে স্কুলে হাতিরা হামলা চালিয়েছে, এমন নজিরও রয়েছে। পরিস্থিতির হাত থেকে বাঁচতে স্কুলের শিক্ষকদেরই প্রথম ওই আন্ডার গ্রাউন্ড গোডাউনের ধারনাটি মাথায় আসে। একটি শ্রেণিকক্ষের মেঝের মধ্যেই তৈরি করা হয় কংক্রিটের ঢালাই করা ১২ বাই ১২ ফুটের গোডাউন। উপরে দেওয়া হয় লোহার মোটা শিটের ঢাকনা। সেটি প্রয়োজনমতো খোলা ও বন্ধ করা যায়। মেঝে থেকে ভূগর্ভস্থ গোডাউনের গভীরতা ৯ ফুট। তাতে ২৫টি চালের বস্তা অনায়াসে রাখা যায়। মিড-ডে মিলের চাল ছাড়াও ডাল, সয়াবিন, লবণ সহ সমস্ত ধরনের আনাজপাতিই সেখানে থাকে।

- Advertisement -

গ্যাস তৈরি হলেও যাতে তা বাইরে বেরিয়ে যেতে পারে, সেজন্য গোডাউন থেকে ৪ ইঞ্চি ব্যাসের একটি পাইপ সোজা শ্রেণিকক্ষের চাল পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এর ফলে খাদ্যসামগ্রীর গন্ধ বাইরে ছড়িয়ে পড়ে না। সব মিলিয়ে খরচ হয়েছিল ৪৫ হাজার টাকা। স্কুলের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক রাজু শায়ের কথায়, ছবছর আগে এই বুঝি বাগান থেকে ফোন এল, এমন আশঙ্কায় রাতে নিশ্চিতে ঘুমোতে পর্যন্ত পারতাম না। গোডাউনটি তৈরি করার পর থেকে আর কোনো সমস্যা নেই। অথচ স্কুল লাগোয়া স্থানেই বাঁশঝাড় থেকে হাতি বাঁশ খেয়ে যায়। কিন্তু ভুলেও আর স্কুলে পা মাড়ায় না। আসলে চাল-ডাল, আনাজপাতি যে রয়েছে, তা হাতিরা বুঝতেই পারে না।

ওই বাগানটিতে আরও তিনটি সরকারি স্কুল রয়েছে। ডায়না লাইনের টন্ডু টিজি নম্বর থ্রি প্রাথমিক স্কুল, টন্ডু ডিভিশনের টন্ডু টিজি স্টেট প্ল্যান প্রাথমিক স্কুল ও টন্ডু জুনিয়ার হাইস্কুলে সারা বছর হাতির হামলা লেগেই থাকে। একই সমস্যায় জেরবার দশা বাগানের পাঁচ থেকে ছটি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রেরও। বামনডাঙ্গার পাশাপাশি খেরকাটা, খাসবস্তি, শিবচু, নিউ খুনিয়া, হৃদয়পুর, জ্বালাপাড়া, ডুডুমারি, আপার কলাবাড়ির মতো বিস্তীর্ণ এলাকার নানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায়দিনই হাতি হানা দেয়। স্কুলবাড়িতে হামলা হলে কোনো ক্ষতিপূরণও মেলে না। ফলে হাতি নিয়ে ত্রাহি ত্রাহি রব ওঠে জঙ্গল লাগোয়া স্কুলগুলিতে। সেখানে বামনডাঙ্গা প্রাইমারি স্কুল মডেল হয়ে উঠতে পারে।

এ বিষয়ে নাগরাকাটার বিডিও স্মৃতা সুব্বা বলেন, দ্রুত স্কুলটি পরিদর্শনে গিয়ে আন্ডার গ্রাউন্ড গোডাউনের ধারণাটি বুঝে আসব। মনে হচ্ছে, প্রকৃত অর্থেই এটি একটি কার্যকরী পদক্ষেপ হয়ে উঠবে। নাগরাকাটার অবর বিদ্যালয় পরিদর্শক বিজয়চন্দ্র বর্মন বলেন, ধারণাটি অভিনব। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানাব।