পড়ুয়াদের স্কুলে টানতে মায়েদের পাঠ

চাকুলিয়া : স্কুলে পড়ুয়াদের উপস্থিতির হার বাড়াতে গ্রামে ঘুরে ঘুরে বারবার ব্যর্থ হয়েছেন স্কুলের শিক্ষকরা। পড়াশোনার প্রতি মায়েদের আগ্রহ না বাড়লে স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা বাড়বে না, এই ভাবনা থেকে পড়ুয়াদের পাশাপাশি তাদের মায়েদের শিক্ষার আলো দেখাতে শুরু করেছে চাকুলিয়া সার্কেলের হরিপুর জুনিয়ার হাইস্কুল।

মনীষীদের মতে, মায়ের শিক্ষা আগে হলে, শিশু শেখে মায়ের কোলে। তাই স্কুল কর্তৃপক্ষ পড়ুয়াদের পাশাপাশি তাদের মায়েদেরও সাক্ষর করার অভিযান শুরু করেছে। মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার সপ্তাহে দুদিন বেলা দুটোয় টিফিনের পর স্কুলে নিরক্ষর মায়েদের পড়াশোনা শেখানো হয়। তাঁদের পাঠদান করে নিকিতা দাস, সমাপ্তি দাসের মতো স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির পড়ুয়ারা। এদের পরিচালনা করেন স্কুলের শিক্ষকরা। এক সময় যে মায়েদের সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর আগ্রহ ছিল না, তাঁরাই এখন নিজেরা স্কুলে আসার জন্য উৎসাহী। পাশাপাশি, সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর জন্য তাঁরা এখন মরিয়া চেষ্টা করছেন। এর ফলে  স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা যেমন বাড়তে শুরু করেছে, তেমনই স্কুলছুট পড়ুয়ার সংখ্যাও কমছে। শুধু তাই নয়, পড়ুয়াদের স্কুলে ধরে রাখার জন্য এখন বহুমুখী পন্থা অবলম্বন করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। শ্রেণিকক্ষের দেয়ালে বিভিন্ন মনীষীদের ও ফুলের ছবি আঁকা হয়েছে। বাংলা ও ইংরেজি বর্ণমালা দিয়ে শ্রেণিকক্ষকে সাজানো হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রতিদিন পড়ুয়াদের আবৃত্তি, নাচ, গান ইত্যাদির মাধ্যমে পড়াশোনায় উৎসাহী করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।

- Advertisement -

২০১০ সালে হরিপুর জুনিয়ার হাইস্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ২০১১ সালে দুজন শিক্ষক এবং একজন শিক্ষিকা স্কুলে যোগ দেন। প্রথমে অল্প কয়েকজন পড়ুয়াকে নিয়ে এর পথ চলা শুরু হয়। স্কুলে কম পড়ুয়া থাকায় রাকেশ সরকার ও রেজাউল করিম নামে স্কুলের দুই সহকারী শিক্ষককে গ্রামে ঘুরে ঘুরে বাচ্চাদের স্কুলমুখী করার চেষ্টা করতে হয়। তাতেও তাঁরা খুব একটা সফল হতে পারেননি। কিন্তু শিক্ষকরা এলাকায় ঘুরে জানতে পারেন, গ্রামের বেশিরভাগ বাসিন্দা গরিব। গ্রামের অধিকাংশ পুরুষ ভিনরাজ্যে শ্রমিকের কাজ করেন। মহিলারা বাড়িতে থাকলেও তাঁরা নিজেরা তেমন পড়াশোনা জানেন না, আবার সন্তানদের স্কুলমুখী করতেও তেমন আগ্রহ প্রকাশ করেন না। পড়ুয়াদের পাশাপাশি তাদের মায়েদের সাক্ষর করে তুলতে না পারলে আগামীদিনে পড়ুয়াদের স্কুলে আনা কঠিন কাজ হবে বুঝতে পেরে ২ জুলাই মায়েদের সাক্ষর করার অভিযান শুরু করা হয়। এই কাজটির সূচনা করেন চাকুলিয়া সার্কেলের অবর বিদ্যালয় পরিদর্শক। এতেই সাফল্য পান স্কুলের শিক্ষকরা। এখন একলাফে স্কুলে পড়ুয়াসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫২। আর স্কুলে পড়াশোনা শিখতে আসা মায়েদের সংখ্যা এখনও অবধি ২৫।

স্কুলের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষিকা দীপমালা দাস বলেন, প্রতিষ্ঠানে আসতে মায়েরা যাতে লজ্জা না পান সেইজন্য স্কুলের পড়ুয়াদের দিয়ে তাঁদের শিক্ষা দেওয়া হয়। আমরা বাইরে থেকে শুধু পরিচালনা করি। অনেক মায়ের কোলে শিশু থাকে। পড়াশোনার সময় কোলের শিশুরা যাতে দুষ্টুমি না করে তাই তাদের জন্য খেলনার ব্যবস্থা করা  হয়েছে। পাশাপাশি, মায়েদের জন্য সন্তান প্রতিপালন কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। মায়েরা শিক্ষিত হলে তাঁদের সন্তানদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ তৈরি হবে। বাস্তবিকই যেদিন থেকে আমরা মায়েদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করতে পেরেছি সেদিন থেকে স্কুলে পড়ুয়াদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে শুরু করেছে। এছাড়াও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করার মধ্য দিয়ে পড়ুয়াদের স্কুলমুখী করার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে।

শিক্ষার প্রতি পড়ুয়াদের আগ্রহ তৈরি করতে অভিনব পন্থা নেওয়ায় এলাকার অভিভাবক মহল থেকে শুরু করে প্রশাসনিক মহলে সাড়া পড়েছে। চাকুলিয়া সার্কেলের অবর বিদ্যালয় পরিদর্শক অঞ্জন পালচৌধুরি বলেন, শিক্ষকরা ভালো কাজ করেছেন। তাঁদের প্রতি আমাদের সবরকম সহযোগিতা থাকবে। ভবিষ্যতে স্কুলটিকে উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারলে এলাকার অন্য স্কুলগুলিকে উৎসাহিত করতে এর আদর্শ তুলে ধরা হবে।