সূর্য-জ্যোৎস্নাকে জীবনের পথে ফেরাচ্ছেন দীপকরা

166

অমিতকুমার রায়, হলদিবাড়ি : বিদ্যার দেবীর পায়ে অঙ্কের বই, ইংরেজির খাতা রেখে প্রার্থনার দিন- পরীক্ষায় যেন খারাপ নম্বর না আসে মা। তাই সকাল সকাল স্নান সেরে স্কুলে হাজির। সেদিন আর ইউনিফর্ম নেই। শুধুই আড্ডা আর সবাই মিলে পাত পেড়ে খাওয়া। এবার অবশ্য আড্ডা-পাত পেড়ে খাওয়া হবে না। তবু সরস্বতীপুজো মানেই কেমন যেন লাগামছাড়া হওয়া সব এলোমলো করে দেয়।

এসব অবশ্য কখনও মনেই আসেনি জয়, সূর্য, জ্যোৎস্নার। ওরা তো কখনও স্কুলেই যায়নি। এমনিতে ওদের দিন কাটে কখনও হলদিবাড়ি স্টেশনে, কখনও পাইকারি বাজারে। কুড়িয়েবাড়িয়ে আনাজ, খাবার যা জোটে। ওদের কাছে সরস্বতীপুজো মানে স্কুলের আনাচে-কানাচে উঁকিঝুঁকি। স্কুলের বেঁচে যাওয়া খাবার যদি পাওয়া যায়, সেই  আশায়। ওদের দিনের পর দিন দেখতেন দীপক বর্মন। ভাবতেন, একটা কিছু করা যায় ওদের জন্য। তাঁর ভাবনার সঙ্গে নিজেদের ভাবনা মিলিয়ে দিলেন রাজীব পাল, রেখা রায়, প্রমীলা ভগত, দীপ মিত্র, মালতী রায়। তাঁদের ভাবনার মিলিত ফসল- পথশিশুদের জন্য একচিলতে পাঠশালা। সরস্বতীপুজোর আগের দিন সোমবার পথশিশুদের মধ্যে শিক্ষার অধিকার পৌঁছে দেওয়ার জন্য লড়াই শুরু করলেন একদল বেকার যুবক-যুবতী। দেবোত্তর বক্সিগঞ্জের ভগতপাড়া এলাকায় দীপক ফাউন্ডেশনের পথ চলা শুরু হল সরস্বতী পুজোর আগের দিন থেকে।

- Advertisement -

দীপক ফাউন্ডেশনের কর্ণধার দীপক বর্মন বলেন, পথশিশুদের তিনটি স্তরে ভাগ করে শিক্ষাদানের পরিকল্পনা নিয়েছি আমরা। প্রথমস্তরের পথশিশুদের প্রাথমিকস্তরে পড়াশোনার জন্য এখানকার তালিপাম ফার্ম হাউসে প্রকৃতিপাঠের মাধ্যমে শিক্ষাদান শুরু হবে। এরপর স্লেট, পেন্সিল ও বইখাতার সঙ্গে গতানুগতিক পাঠদান হবে। তৃতীয়স্তরে এই শিশুদের নাম সরকারি বিদ্যালয়ে নথিভুক্ত করা হবে যাতে প্রতিটি শিশুর শিক্ষার অধিকারকে সুনিশ্চিত করা যায়। দীপক জানান, সেইসঙ্গে ওদের নিয়মিত কাউন্সেলিং করা হবে, যাতে তারা শিক্ষা থেকে কোনওভাবেই বিপথগামী না হয়। গতানুগতিক শিক্ষার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বিষয়ে স্বাবলম্বী করা হবে, ওদের মধ্যে সুপ্ত প্রতিভাকে যাতে জাগিয়ে তোলা যায়।

এই প্রকল্পের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছেন অনেকেই। তাঁদের একজন আলো পত্রিকার সম্পাদক আজাদ হোসেন। তিনি বলেন, দীপক ফাউন্ডেশন ও তালিপাম ফার্ম হাউস শিশু ও প্রকৃতিকে ভালোবেসে কাজ করে যাবে। এটাই আমাদের লক্ষ্য। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি নাট্যনির্দেশক ও অভিনেত্রী ঊর্ণাবতী সেন বলেন, পথশিশুদের বুঝতে হবে। কারণ আমাদের ভালোবাসার অভাবেই আজ অনেক শিশুর পথেই দিন কাটে। স্কুলের পড়ুয়াদের জন্য আবৃত্তি, নাচের আয়োজন ছিল। সবকিছু দেখে ঘোর কাটছে না জয় ব্যাধ, সূর্য ব্যাধ, জ্যোৎস্না ব্যাধের। এমন একটা স্কুলে ওরা পড়বে ভাবতেই পারছে না। তালিপাম স্কুলের শিক্ষক রাজীব পাল বলেন, প্রথমদিনই প্রকৃতিপাঠের পাশাপাশি আমাদের ছাত্রছাত্রীদের স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে তাদের মুখে পুষ্টিকর খাবার তুলে দেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত কোলাজের প্রতিষ্ঠাতা দীপঙ্কর মণ্ডল বলেন, সরকার ঠিক যেটা চাইছে ওই যুবক-যুবতীরা সেটি বাস্তবে করে দেখাচ্ছেন। আমি তাঁদের আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই। আন্তরিক নামে আরেকটি পত্রিকার সম্পাদক সৌমিতা মিত্র বলেন, স্কুলের বাইরে থাকা পথশিশুদের স্কুলমুখী করার জন্য এলাকার যুবক-যুবতীরা যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তার সাফল্য কামনা করি।

তালিপাম- লুপ্তপ্রায় এক ধরনের গাছ। দুনিয়ার হাতেগোনা কয়েকটি তালিপাম গাছ বেঁচে রয়েছে। পৃথিবী থেকে এভাবে গাছেরা যেন হারিয়ে না যায়, তারজন্য সেই গাছের নামেই ফার্ম হাউসের নামকরণ। সেখানে প্রকৃতির কোলে পথশিশুদের জীবনের পথে ফিরিয়ে আনার লড়াই করছেন একদল তথাকথিত বেকার যুবক-যুবতী, যাঁরা চাকরি না পেয়ে শুধু প্রাইভেট টিউশন দিয়ে জমানো টাকায় মানুষ গড়ার স্বপ্ন দেখেন।  হলদিবাড়ির বিডিও তাপসী সাহা বলেন, ওঁদের সাধুবাদ জানাই।