চাঁদে আরও জল, দাবি বিজ্ঞানীদের

নিউ ইয়র্ক : ছোটবেলা থেকে শুনে আসা পৃথিবীর তিনভাগ জল আর একভাগ স্থলের গল্পগুলি নিখাদ ভৌগোলিক তথ্যের বাইরে বেরিয়ে সুকুমার রায়ের অবাক জলপান-এ জায়গা করে নিয়েছে। সেই জল নিয়ে শুধু পৃথিবীই যে তোলপাড় হয়, তাই নয়। এবার চাঁদের জলের খবর সংবাদ শিরোনামে। চন্দ্রপৃষ্ঠে যে জলের উপস্থিতি রয়েছে, এ খবর আমাদের সকলেরই জানা। তবে আমরা যতটা জানতাম, বিজ্ঞানীদের দাবি, তার চেয়ে অনেক বেশি জল রয়েছে চাঁদের মাটিতে। এই জলের অণুগুলি চাঁদের মাটিতে থাকা খনিজ শস্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। সবচেয়ে বড় কথা চাঁদের যে পৃষ্ঠে স্থায়ী ছায়া থাকে সেই পৃষ্ঠেও যথেষ্ট পরিমাণ জল থাকতে পারে বলে তাঁরা মনে করেন।

এগারো বছর আগে একটি সমীক্ষায় বলা হয়, চাঁদের মাটিতে বিস্তৃত আকারে অল্প পরিমাণ জল থাকতে পারে। কিন্তু একটি গবেষক দলের সাম্প্রতিকতম গবেষণায় চাঁদের মাটিতে জলের বিস্তৃতির শনাক্তকরণের স্বপক্ষে অস্পষ্ট হলেও প্রাথমিক প্রমাণ জোগাড় করতে পেরেছে। একই সময় অন্য একটি গবেষক দল দাবি করেছে, চাঁদের প্রায় ১৫,০০০ বর্গমাইল (প্রায় ৪০,০০০ বর্গকিলোমিটার) বিস্তৃত ছায়ার অংশে বরফের পকেটে লুকোনো অবস্থায় জলের অস্তিত্ব রয়েছে।

- Advertisement -

জল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। চন্দ্রপৃষ্ঠে অতিরিক্ত জলের উপস্থিতি ভবিষ্যতের রোবটিক মিশনগুলির ও মহাকাশচারীদের জল সরবরাহ, জ্বালানির উপাদান ও পানীয় জলের ব্যবহারের পক্ষে সহায়ক হতে পারে। মেরিল্যান্ডের নাসার গার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের একটি দল এখন চাঁদের পৃষ্ঠে আণবিক জল শনাক্ত করেছে। তাদের মতে, সেই অণুগুলি হয়তো কোনও ধ্বংসাবশেষের মধ্যে আটকে পড়ে আছে। পূর্বের পর্যবেক্ষণে সম্ভবত জল এবং তার আণবিক আত্মীয় হাইড্রক্সিলের মধ্যে বিভ্রান্তি ঘটেছিল। নতুন অনুসন্ধানে এমন একটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে যা অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে নির্ভুল।

অবশ্য চাঁদের যে পৃষ্ঠে এই জলের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে, সেখানে জলের অস্তিত্ব থাকা তখনই সম্ভব যদি তা হিমশীতল পূর্বতন পরিবেশ থেকে রক্ষা করে খনিজ শস্যের ভিতরে আবদ্ধ থাকে। গবেষকরা টেলিস্কোপ ব্যবহারের জন্য সংশোধিত বোযিং ৭৪৭এসপি মহাকাশযানের সোফিয়া আয়ারবর্ন অবজার্ভেটরি নামের একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করে তথ্যগুলি সংগ্রহ করে। হননিবল বলেন, অনেকে মনে করেন আমি যা আবিষ্কার করেছি, তা হয়তো জলীয় বরফ পিণ্ড। কিন্তু তা সত্যি নয়। আমি যা আবিষ্কার করেছি তা কেবলমাত্র জলের অণু। আর তারা এতটাই ছড়িয়েছিটিয়ে আছে যে, তরল জল বা জলীয় বরফ গঠনের জন্য কোনওভাবেই একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ সংগঠিত করতে পারে না।

নেচার অ্যাস্ট্রোনমি জার্নালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দ্বিতীয় গবেষণাটি সম্পর্কে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, সেখানে মূলত চাঁদের অন্ধকার অংশের দিকে বেশি করে মনোনিবেশ করা হয়েছে। চন্দ্রপৃষ্ঠের যে অংশে স্থায়ীভাবে অন্ধকার থাকে অর্থাৎ যে অংশে আলো পৌঁছোয় না, সেখানকার তাপমাত্রা মাইনাস ২৬০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা প্রায় মাইনাস ১৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই অঞ্চলটি এতটাই ঠান্ডা যে, এখানে কয়েক বিলিয়ন বছর ধরে জল হিমায়িত অবস্থায় থাকতে পারে।

কলরোডা বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রহ বিজ্ঞানী পল হায়েনের নেতত্বাধীন গবেষক দল নাসার পাঠানো অরবিটার মহাকাশয়ানের চন্দ্রপৃষ্ঠের প্রাথমিক নিরীক্ষণ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে কতগুলি বোল্ডারের খোঁজ পান। যেগুলি ছোট ছোট কয়েনের মতো কয়েক মিলিয়ন ছায়ার সমষ্টি ছাড়া আর কিছু নয়। তার বেশিরভাগটাই মেরু অঞ্চলে অবস্থিত। হায়েন বলেন, আমাদের গবেষণা এটাই প্রমাণ করে যে, চাঁদের ইতিপূর্বে অজানা অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে জলীয় বরফ থাকতে পারে।

তিনি বলেন, আমরা যে ফলাফল পেয়েছি, তাতে এটাই প্রতিষ্ঠিত হয় যে, চাঁদের মেরু অঞ্চলে জল আগের থেকে অনেক বেশি পরিমাণে বিস্তৃত হয়েছে। যা অনেক সহজে ব্যবহার, নিষ্কাশন ও বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। মঙ্গলে গবেষক দল পাঠানোর নাসার যে পূর্ব পরিকল্পনা ছিল, সেখান থেকে কিছুটা সরে এসে নাসা চাইছে মহাকাশচারী দলকে চাঁদে পাঠাতে, যেখান থেকে জল তোলা এবং ব্যবহারের এক গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে এই প্রচেষ্টাকে সফল করতে পারে। হননিবল বলেন, চন্দ্রপৃষ্ঠে জল কেবলমাত্র মেরু অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নেই। আমরা যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করেছে।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। বলা যেতে পারে এখান থেকেই রহস্যের শুরু। এখন প্রশ্ন হল, চন্দ্রপৃষ্ঠে জল এল কোথা থেকে? এই প্রশ্নের জবাবে হায়ান বলেন, এটা ঠিক যে এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে বড়, চাঁদের মাটিতে জলের উৎস কী? আমরা এই গবেষণা এবং অন্য গবেষণাগুলির মাধ্যমে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছি। তিনি বলেন, বর্তমানে উৎসের সম্ভাব্য উপাদান হতে পারে ধূমকেতু, ছোট গ্রহাণু, ধূলিকণা, সৌরবায়ু কিংবা চাঁদের নিজস্ব আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ থেকে বেরিয়ে আসা উপাদান।

পৃথিবী একটি ভেজা অঞ্চল, যেখানে নোনা জলের সমুদ্র আছে, বড় মিষ্টি জলের হ্রদ আছে, বরফের পাহাড় আছে যা জলাধার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। হায়ানের মতে, আমাদের নিকটতম মহাজাগতিক উপাদান হিসেবে চাঁদে জলের উৎসের সন্ধান, পৃথিবীর জলের উৎসের সন্ধানেও আলোকপাত করতে পারে, যা গ্রহ বিজ্ঞানের কাছে এখনও একটি বড় প্রশ্ন।