উত্তরের নয়া আবিষ্কার উত্তর সুগন্ধি চালের গন্ধে মাতবে দেশ

160

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : উত্তর সুগন্ধির গন্ধে এবার মাতবে আসমুদ্রহিমাচল। গোবিন্দভোগ, তুলাইপাঞ্জির পর চালের সুগন্ধে মাত করতে আসছে উত্তর সুগন্ধি। উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক পিওরলাইন সিলেকশন-এর মাধ্যমে সুগন্ধি চালের ওই নতুন প্রজাতি চিহ্নিত করেছেন। ইতিমধ্যেই অত্যন্ত সফলভাবে উত্তর সুগন্ধির আবাদও হয়েছে। কৃষিবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, উত্তর সুগন্ধি আদতে কালো নুনিয়ারই একটি নতুন জাত। এলাকাভেদে চাষের ফলে প্রাকৃতিকভাবে সেই জাতে জিনগত পরিবর্তন ঘটেছে। ফলে খাদ্যগুণ, ফলন, সুগন্ধ সহ বিভিন্ন দিক থেকে চিরাচরিত কালো নুনিয়ার প্রজাতির থেকে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে উত্তর সুগন্ধি।

স্বীকৃতির জন্য ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ এগ্রিকালচারাল রিসার্চ (আইসিএআর)-এ পাঠানো হয়েছে উত্তর সুগন্ধি। তাই আইসিএআর-এর তরফে দেশের বেশ কয়েকটি রাজ্যে পরীক্ষামূলকভাবে উত্তর সুগন্ধির চাষ শুরু হয়েছে। রাজ্য সরকারের স্বীকৃতির জন্যও পদ্ধতিগতভাবে আবেদন করেছেন বিজ্ঞানীরা। সেই কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রাজ্যের বিভিন্ন জেলাতেও পরীক্ষামূলক চাষ সফল হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, পদ্ধতিগতভাবে কিছুদিনের মধ্যেই সরকারিভাবে প্রকাশ হবে উত্তর সুগন্ধি। ওই ধানের চাষের পদ্ধতি সম্পর্কে বিভিন্ন জেলার কৃষকদের প্রশিক্ষণও দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক ও বিজ্ঞানীরা।

- Advertisement -

উত্তরবঙ্গ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের ১৫০টি সুগন্ধি চালের প্রজাতি নিয়ে বছর ছয়েক আগে গবেষণা শুরু হয়েছিল উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেই গবেষণার বিভিন্ন পর্যায়ে প্রজাতিগুলির গুণাগুণ পর্যালোচনা করা হয়। দেখা যায় কোনওটির গন্ধ, কোনওটির ফলন, কোনওটির মিষ্টতা (গ্লাইসেমিক ইনডেক্স), আবার কোনওটির রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা বেশি। প্রজাতিগুলির ভালো গুণের জিনগুলি চিহ্নিত করে প্রজনন পদ্ধতিতে একটি জিনের সঙ্গে অন্য জিন যুক্ত করে ১২টি নতুন সংকর প্রজাতির ধান তৈরি করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানের বিভিন্ন পদ্ধতিতে পর্যায়ক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মে সেইসব প্রজাতির সফল চাষও হয়েছে। এখন সেই প্রজাতিগুলিকে আঞ্চলিকস্তরে আবাদের জমিতে চাষ করতে হবে। সেই প্রক্রিয়া চলছে।

ইতিমধ্যেই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের কাজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়েছে। চলতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান পত্রিকা নেচারে সেই গবেষণার কথা প্রকাশিতও হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্ল্যান্ট প্যাথলজি, প্ল্যান্ট বায়োকেমিস্ট্রি, সিড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনলজি- এই তিন বিভাগ যৌথভাবে সুগন্ধি চালের উপর কাজ করছে। পাঁচজন কৃষিবিজ্ঞানী এবং আটজন কৃষি গবেষক, মোট ১৩ জনের একটি দল গোটা বিষয়টিতে যুক্ত রয়েছে। এই দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্ল্যান্ট প্যাথলজির বিভাগীয় প্রধান অপূর্ব চৌধুরী। সুগন্ধি চাল নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা প্রাকৃতিকভাবে কালো নুনিয়ার জিন পরিবর্তনের ব্যাপারটি লক্ষ করেন।

এরপর উত্তরবঙ্গের ১০টি আলাদা এলাকা থেকে তাঁরা কালো নুনিয়ার প্রজাতি সংগ্রহ করেন। সেগুলিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মে চাষ করা হয়। পৃথকভাবে প্রত্যেকটি প্রজাতির জিনগত বৈশিষ্ট্যকে নথিভুক্ত করা হয়। এই পদ্ধতিকে বলা হচ্ছে সিলেকশন। দীর্ঘ গবেষণার পর ২০২০ সালে সেই প্রজাতিগুলির মধ্যে ২০টিরও বেশি প্যারামিটারের বিচারে সেরা প্রজাতিটিকে আলাদা করে চিহ্নিত করা হয়, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় পিওরলাইন সিলেকশন। অপূর্ববাবু জানিয়েছেন, সুগন্ধি চাল ও উত্তরবঙ্গ – দুটি বিষয়ে সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই তাঁরা কালো নুনিয়ার সেই সেরা প্রজাতিটির নাম রেখেছেন উত্তর সুগন্ধি।

বিভিন্ন প্রজাতির জিন পরিবর্তনের বিষয়টি তত্ত্বাবধান করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে সিড সায়েন্সের বিভাগীয় প্রধান বিধান রায়। খাদ্যগুণ পর্যালোচনার কাজ করছেন বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের দুই সহকারী অধ্যাপক সোমনাথ মণ্ডল এবং নন্দিতা সাহা। উত্তর সুগন্ধি নিয়ে প্রত্যেকেই অত্যন্ত আশাবাদী। অপূর্ববাবু বলেন, বাংলার সুগন্ধি চালের মানচিত্রে উত্তর সুগন্ধি নতুন দিশা দেখাবে। একাধিক প্যারামিটারে যে কোনও সুগন্ধি চালকে টেক্কা দেওয়ার যাবতীয় রসদ ওই ধানে রয়েছে। চিরাচরিত প্রজাতির তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ফলন হওয়ায় কৃষকরাও উত্তর সুগন্ধি চাষে অনেকটাই লাভবান হবেন।

কালো নুনিয়া নিয়ে গবেষণার জন্য আইসিএআর নিস এরিয়া অফ এক্সেলেন্স প্রকল্পে উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে যুক্ত করেছে। পূর্ব ভারতে একমাত্র ইউবিকেভি-ই ওই প্রকল্পে স্থান পেয়েছে। প্রকল্পে অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি তৈরি করে দেওয়ার পাশাপাশি প্রাথমিক পর্যায়ে তিন বছরের গবেষণার জন্য আড়াই কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে আইসিএআর।