রহিত বসু : লকডাউনে অনেকের অনেক অজানা প্রতিভা সামনে চলে আসছে। কেউ গান গাইছেন, কেউ আবৃত্তি করছেন, কেউ বিশুদ্ধ জ্ঞান দিচ্ছেন। আর সব কিছুই সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। যে গৃহবধূকে বিয়ে পর থেকে প্রতিদিন ১৩২ রকমের কাজ করতে হয়, তিনি যে কত ভালো গানও গাইতে পারেন, লকডাউনের দৌলতে সেকথাও জানা হয়ে গেল।

তেমনই আমরাও জেনে গেলাম, সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র এই লকডাউনের বাজারে নুসরতের টিকটক ভিডিও দেখে ফেলেছেন। শুধু দেখেই ফেলেননি, ভিডিওতে নুসরতের ভঙ্গি দেখে তিনি ক্রুদ্ধ হয়েছেন এবং টুইটারে দুকলম লিখেও ফেলেছেন। সিপিএম নেতা ব্যক্তিগত জীবনে কী করবেন, কার ভিডিও দেখবেন, সেই ভিডিও দেখে তাঁর কী প্রতিক্রিয়া হবে, তা নিয়ে আমাদের মাথা না ঘামালেও চলে। কিন্তু তাঁর প্রতিক্রিয়া যদি সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে জনগণের দরবারে চলে আসে, তাহলে তো জনগণকে মাথা ঘামাতেই হয়। সে সিপিএম ৭ পার্সেন্ট হলেও মাথা ঘামাতে হবে, ৫ পার্সেন্ট হলেও মাথা ঘামাতে হবে। এবং সূর্যবাবুকেও শুনতে হবে তিনি কতটা মিসোজিনিস্ট, তাঁর জেন্ডার বায়াস কতটা ইত্যাদি ইত্যাদি।

- Advertisement -

করোনার মরশুমে সূর্যবাবু এমন একটা টুইট না করলেই পারতেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের লোক হওয়ায় বিজ্ঞানমনস্ক রাজনীতিক হিসেবে তাঁর সামনে আলাদা পরিচিতি তৈরির সুযোগ এসেছিল, যেমনটি এসেছিল সুজন চক্রবর্তীর সামনে। দুজনেই কত শিক্ষিত, একজন ডাক্তার, অন্যজন আধুনিক একটি বিষয়ে ডক্টরেট করে ফেলেছেন। এমন বিপর্যয়ে মরশুমে মানুষকে কতটা সচেতন করতে পারতেন। কিন্তু সুজনবাবুকে দেখুন, শুধু কংগ্রেস নেতার পাশে বসে টিভিতে মুখ দেখিয়ে সময় চলে গেল।

রাজনীতিতে বিজ্ঞানের ডিগ্রিওয়ালা মানুষ হয়তো অনেক আছেন, কিন্তু তাঁরা সকলেই য়ে বিজ্ঞানমনস্ক, সেকথা বলা যাবে না। যেমন ধরুন, বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন, মাস্ক নাকের নীচে বা গলার নীচে ঝুলিয়ে রাখা উচিত নয়। গ্লোবাল অ্যাডভাইজরি কমিটির যে সব সদস্য মাঝে মাঝে টিভিতে পরামর্শ দেন, তাঁরাও সে কথা জানেন। অথচ ভাষণ দেওয়ার সময় মাস্কটি গলার নীচে ঝুলতে থাকে। এখন তাঁদের কে শেখাতে যাবে! বিজ্ঞানমনস্কতা কাকে বলে সেটা কেরলের স্বাস্থ্যমন্ত্রী কে কে শৈলজা এবং জার্মান চ্যান্সেলার অ্যাঞ্জেলা মের্কেলকে দেখে শিখতে হবে। কে কে শৈলজার কাজ নিয়ে এখন সারা বিশ্বে হইচই হচ্ছে। অথচ তাঁর কিন্তু তেমন কোনও হাতি-ঘোড়া ডিগ্রি নেই। বিএসসি ডিগ্রি। তিনিই গোটা দেশকে করোনা মোকাবিলার পথ দেখিয়েছেন।

আর অ্যাঞ্জেলা মের্কেলের কথা কেন সামনে আসছে? কারণ, তিনি দেখিয়েছেন, বিপর্যয় মোকাবিলার কৌশল রচনা করতে গেলে কেন তথ্যভাণ্ডার থাকা জরুরি। এমনিতে তিনি কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রিতে পিএইচডি করেছেন, দীর্ঘদিন গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অতএব করোনা মোকাবিলায় তাঁর প্রতিটি পরিকল্পনায় বিজ্ঞানের ছোঁয়া দেখতে পাবেন। এখনও পর্যন্ত জার্মানিতে ২০ লক্ষের বেশি মানুষের টেস্ট হয়েছে। সেখানে করোনার চিকিৎসায় দ্বিস্তরীয় ব্যবস্থায় সাফল্য এসেছে, যা আমেরিকার মতো প্রবল শক্তিশালী দেশ করে উঠতে পারেনি। অথচ সেদেশের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে দেখুন। প্রতিদিন কিছু না কিছু ভুলভাল বলে চলেছেন। একজন বিজ্ঞানী রাষ্ট্রনায়কের সঙ্গে একজন ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদের ফারাক এখানেই। এমনি সময়ে জনগণকে মিথ্যা আশা দেখিয়ে ভুল বুঝিয়ে ধর্মের জালে ফাঁসিয়ে ভোট জোগাড় করা যেতে পারে। কিন্তু করোনার মতো অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়তে গেলে একজন বিজ্ঞানমনস্ক রাষ্ট্রনায়কের প্রয়োজন।