টার্গেট শিলিগুড়ি করিডর, চিকেন নেকে অশনিসংকেত

911

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশ দিয়ে ঘেরা শিলিগুড়ি করিডর বা চিকেন নেকের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে তিন সীমান্ত সুরক্ষায় কড়া পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছে প্রতিরক্ষামন্ত্রক। তিন সীমান্তেই ১৫ কিমি এলাকাজুড়ে তৈরি হচ্ছে মাল্টি লেয়ার সিকিউরিটি রিং। বসানো হচ্ছে ইলেক্ট্রনিক কার্গো ট্র‌্যাকিং সিস্টেম। উত্তরবঙ্গের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কম্প্রিহেনসিভ ইন্টিগ্রেটেড বর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম কার্যকর করবে বিএসএফ। সীমান্ত সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) এবং সশস্ত্র সীমা বল (এসএসবি)-এর কাছে সেই সংক্রান্ত নির্দেশিকা পৌঁছেছে বলেই খবর। মন্ত্রক সূত্রে জানা গিয়েছে, সম্প্রতি দিল্লিতে সীমান্ত সুরক্ষা নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। সেই বৈঠকে বিএসএফ এবং এসএসবি-র শীর্ষ আধিকারিকরা উপস্থিত ছিলেন। সীমান্তের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে তাদের কী ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হচ্ছে সেই বিষয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রকে বিস্তারিত রিপোর্ট পাঠিয়েছেন দুই সুরক্ষা বাহিনীর কর্তারা। সুরক্ষার প্রশ্নে এখনই বিস্তারিত তথ্য জানাতে রাজি হননি বিএসএফ বা এসএসবির আধিকারিকরা। বিএসএফের উত্তরবঙ্গ ফ্রন্টিয়ারের আইজি সুনীল কুমার বলেন, কাঁটাতারহীন সীমান্ত এলাকায় ইতিমধ্যেই নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট ফেন্সিং দেওয়া হচ্ছে। সীমান্ত সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে যাবতীয় পদক্ষেপ করা হচ্ছে।
চিন সীমান্তে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। উত্তর-পূর্ব ভারত সহ উত্তরবঙ্গ লাগোয়া সিকিমের সীমান্ত এলাকায় চিন একদিকে যেমন তাদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করতে শুরু করেছে অন্যদিকে বাড়তি সেনাও মোতায়েন করছে। চিনা আগ্রাসন শিলিগুড়ি করিডরের পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে আগেই সতর্ক করেছেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা। তার ভিত্তিতে ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং বায়ুসেনা একাধিক পদক্ষেপ করেছে। সিকিমে চিন সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে থাকা সেনার ৩৩ কর্পস, বাযুসেনার হাসিমারা, বাগডোগরা এয়ার বেসের শক্তি বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তের একটা বড় অংশে কোনও কাঁটাতার নেই। নেপাল ও ভুটান সীমান্তও পুরোপুরি খোলা। সেই সুযোগকে ব্যবহার করে চিন শিলিগুড়ি করিডরের ক্ষতি করতে পারে বা সেখানে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে পারে বলেই আশঙ্কা করছেন গোয়েন্দারা। তাই করিডর ঘিরে থাকা তিন সীমান্তের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর প্রতিরক্ষামন্ত্রক। বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে আছে বিএসএফ। নেপাল ও ভুটান দুই সীমান্ত সুরক্ষার দায়িত্ব এসএসবির হাতে। সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একাধিক পদক্ষেপ করছে এসএসবি। সূত্রের খবর, ভারত-নেপাল সীমান্ত সুরক্ষায় প্রাথমিকভাবে স্পর্শকাতর এলাকা চিহ্নিত করে বেড়া লাগানোর প্রস্তাব দিয়েছে এসএসবি। সীমান্তে বাড়ানো হচ্ছে ইন্টিগ্রেটেড চেকপোস্টের সংখ্যা। অন্যান্য সুরক্ষাবাহিনীর আদলে ২০১৮ সালে এসএসবি-তে পৃথক গোয়েন্দা বিভাগ বা জি-ব্রাঞ্চ চালু হয়। সেই বিভাগে কর্মী ও আধিকারিকের সংখ্যাও বৃদ্ধি করা হচ্ছে। বাছাই করা জওয়ানদের নিয়ে তৈরি হচ্ছে জি ব্রাঞ্চের বিশেষ দল। যেসব সীমান্ত এলাকায় নদী রয়েছে সেখানে নজরদারিতে  প্রশিক্ষিত কুকুরদেরও কাজে লাগাবে এসএসবি। বাহিনীর হেডকোয়ার্টারের এক শীর্ষস্থানীয় আধিকারিক বলেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রক থেকে দশ দফা সুরক্ষা বন্দোবস্তের কথা বলা হয়েছে। সেইমতো ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটি ফ্রন্টিয়ারকে সতর্ক করা হয়েছে। বিএসএফ সূত্রে জানা গিয়েছে, খোলা সীমান্তের বেশিরভাগ জায়গায় স্মার্ট ফেন্সিংয়ের জন্য পদক্ষেপ করা হয়েছে। কম্প্রিহেনসিভ ইন্টিগ্রেটেড বর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে ২০১৯ সালে অসমের ধুবড়ির বাংলাদেশ সীমান্তে স্মার্ট ফেন্সিং দিয়েছিল বিএসএফ। অত্যাধুনিক বিদেশি প্রযুক্তিনির্ভর ওই ব্যবস্থায় উন্নত নানা ডিভাইস, সেন্সর, ক্যামেরা, লেসার, ওয়্যারলেস কমিউনিকেশন ব্যবহার করা হয়। যা কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। কাঁটাতারের বেড়া না থাকলেও প্রযুক্তি অকেজো করে সীমান্ত পার করা বাস্তবে অসম্ভব বলেই জানিয়েছেন বিএসএফ কর্তারা। মাল্টি লেয়ার সিকিউরিটি রিং নিয়ে এখনই মুখ খুলতে না চাইলেও বিএসএফের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, ওই সুরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে রাজ্য পুলিশ বা পুলিশের  স্পেশাল টাস্ক ফোর্স। তিন সীমান্তেই যেহেতু একাধিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র আছে তাই সেই কেন্দ্রগুলি দিয়ে যাতায়াতকারী সমস্ত পণ্যবাহী লরির উপরও নজরদারি রাখতে চাইছে প্রতিরক্ষামন্ত্রক। পণ্যের আড়ালে সেগুলিতে অস্ত্র, বিস্ফোরক বা অন্য কিছু পাচার হচ্ছে কি না সেটা নিশ্চিত করতে বাণিজ্য কেন্দ্রগুলিতে ইলেকট্রনিক কার্গো ট্র‌্যাকিং সিস্টেম চালুর উদ্যোগও নিয়েছে মন্ত্রক। তার জন্য ইতিমধ্যেই সমীক্ষাও হয়েছে বলেই খবর।