প্রত্যাশার পারদ বাড়িয়ে নতুন উচ্চতার খোঁজে সেনসেক্স ও নিফটি

112

গত সপ্তাহেও নতুন উচ্চতা ছুঁল শেয়ার বাজারের দুই জনপ্রিয় ইনডেক্স নিফটি ও সেনসেক্স। অর্থনীতির সঙ্গে শেয়ার বাজারের একটি নিবিড় সম্পর্ক থাকলেও অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা সবসময় শেয়ার বাজারকে স্পর্শ করে এমনটিও নয়। এই বাজারে দুটি সবচেয়ে শক্তিশালী আবেগ হল ভীতি ও লোভ। বর্তমানে বিভিন্ন শেয়ারে যে বিনিয়োগ চলছে, তা এই বিশ্বাস থেকে যে- ভ্যাকসিন মানুষকে সুরক্ষিত করবে, দেশের অর্থনীতির বৃদ্ধি ঘটবে আগামী বছরগুলিতে, কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাবে, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে এবং কোম্পানিগুলি তাদের ব্যবসার বিস্তার, বিক্রি এবং লাভ বৃদ্ধি করে যেতে পারবে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে চললে দেশের সমস্ত পণ্যের ওপর তার প্রভাব পড়তে বাধ্য। ভারত সুবিশাল দেশ হওয়ার জন্য দেশের নানা স্থানে নানা কোম্পানির কারখানা রয়েছে। সেখান থেকে তাদের তৈরি পণ্য সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে প্রয়োজন লজিস্টিক্স। অর্থাৎ যে গাড়িগুলি পণ্য সারা দেশে বণ্টন করবে। এখন তেলের দাম বৃদ্ধি হলে এই বহন করার খরচও বৃদ্ধি পাবে। প্রভাব পড়বে পরিবহণে। পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ ক্রয় কম করলেও মূল্য কমানোর সম্ভাবনা কমে যাবে কোম্পানিগুলির পক্ষে। কেবল যে সাপ্লাই ও ডিমান্ড মেনে মূল্যবৃদ্ধি হয়, তা নয়, ডিমান্ড কম থাকলেও মূল্যবৃদ্ধি হতে পারে। এই অবস্থা যে কোনও দেশের পক্ষেই উদ্বেগের। এখানে চিন্তায় থাকবে আরবিআই-ও। একদিকে প্রয়োজন দ্রুত আর্থিক বৃদ্ধি। অন্যদিকে চিন্তা ক্রমবর্ধমান মূল্যের। ফলে আরবিআই যদি খরচের রাশ টানতে রেপো রেট বৃদ্ধি করে তাহলে দেশের বিভিন্ন শিল্পে যেমন রিয়েল এস্টেট, সিমেন্ট, স্টিল, এনবিএফসি, ব্যাংক প্রভৃতি প্রবল ধাক্কা খাবে এবং তা ঘটলে শেয়ার বাজার সরাসরি প্রভাবিত হবে। তেল আমদানির ওপর পুরো নির্ভরশীল হয়ে থাকলে দেশের অগ্রগতি যে বাধাপ্রাপ্ত হবে, তা ভারত সরকার বুঝেই ফসিলজাত জ্বালানি থেকে সৌর, বাযু, জিওথার্মাল প্রভতি শক্তির দিকে এগোচ্ছে।

গত কয়েক মাসে কেমিক্যাল কোম্পানিগুলি যে হারে বৃদ্ধি হচ্ছে, তার মধ্যে সেইগুলিই গুরুত্ব পাচ্ছে যারা ভারত ইলেক্ট্রিক গাড়ির জন্য ব্যাটারি তৈরি করতে পারবে। এমনকি আদানি, রিলায়েন্স, টাটার মতো বড় বড় গ্রুপগুলিও নিজেদের পুরো নিয়োজিত করছে এই ধরনের শক্তি উৎপাদন করতে। তবে ম্যানুফ্যাকচারিংকে ছাড়িয়ে অতি দ্রুত হারে বিনিয়োগকারীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে অনলাইন সার্ভিসেস কোম্পানিগুলি। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আইটি কোম্পানিগুলিও। গত এক সপ্তাহে বহু আইটি কোম্পানি তাদের সর্বকালীন উচ্চতা ছাড়িয়ে গিয়েছে। এবং এটা যে কেবল ছোট বা মাঝারি মাপের কোম্পানিগুলির ক্ষেত্রে ঘটছে তা নয়, লার্জ ক্যাপগুলিতেও ছোঁয়া লেগেছে। মাইন্ড ট্রি, এমক্যাসিন, কোফর্জ, এলঅ্যান্ডটি ইনফোটেক সবগুলিতেই মানুষ বিনিয়োগ করে চলেছেন। ভারতে অনলাইন সার্ভিসেস যে জনপ্রিয় হচ্ছে, তার প্রমাণ ইনফো এজ, ম্যাট্রিমনি, ইজি ট্রিপ প্রভৃতি। বাজারে আইপিও নিয়ে তাদের পরিকল্পনা রয়েছে। বাজার পেটিএম, ন্যাকা প্রভতি কোম্পানি রয়েছে। সম্প্রতি যে সার্ভিসেস কোম্পানি নিয়ে বাজারে খুব উৎসাহ সৃষ্টি হয়েছে, তা হল জোম্যাটো। যারা আইপিও বাজারের সঙ্গে পরিচিত। এই অতিমারিকালে ২০২০-২১এ যে পরিমাণ আইপিও বাজারে এসেছে, তা এককথায় অভাবনীয়। শুধু তাই নয়, তাদের লিস্টিংয়ে দিন সাফল্য বিনিয়োগকারীদের আরও উত্সাহিত করেছে। এই আইপিওগুলি পুরো সাবস্ক্রাইবড হওয়ার অর্থ এই যে, ভারতীয় বাজারে যে অর্থের সার্কুলেশন রয়েছে, সেটাই ব্যবহৃত হচ্ছে আইপিওগুলিতে। জোম্যাটো নিয়ে কথা বলার সময় বলা ভালো যে, এই কোম্পানিটার লিস্টিং হওয়ার সময় আনুমানিক মার্কেট ক্যাপিটাল দাঁড়াতে পারে ৫০ হাজার কোটি টাকার কাছে। অর্থাৎ লার্জ ক্যাপ বা বিশাল কোম্পানি। অনেক মানুষই হয়তো এই আইপিওতে আবেদন করছেন। সেইজন্য জোম্যাটোকে একটু বিস্তারিত জানার প্রয়োজন রয়েছে। এর প্রাইস ব্যান্ড ৭২-৭৬ টাকা। তারা এই আইপিওর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের কাছে থেকে প্রায় ৯৩৭৫ কোটি টাকা তোলার চেষ্টা করছে। তবে যেটা চিন্তার কারণ হল, সেটা তার গত তিন অর্থবর্ষে ক্রমাগত ৮০০ থেকে ২০০০ কোটি টাকার ক্ষতি দেখানো। এর আগে জোম্যাটোর মতো সমতুল্য কোম্পানির লিস্টিং হয়নি। ফলে একটি ৫০ হাজার কোটি টাকার কোম্পানি গত কয়েক বছরে লাভের মুখ দেখেনি। এটা কিন্তু দ্বিধা রেখে যায় বিনিয়োগকারীর মনে। এটা মনে হতে পারে যে, দ্রুত হারে ব্যবসা বৃদ্ধির জন্য এই কোম্পানি লাভের দিকে মনোনিবেশ করছে না। ভবিষ্যতে হয়তো তারা লাভের জন্য ঝাঁপাবে। সেক্ষেত্রে ভারতে এমন বহু কোম্পানি রয়েছে, যাদের মার্কেট ক্যাশ জোম্যাটোর সমতুল্য এবং তাদের কয়েকশো থেকে হাজার কোটি টাকার ওপর বার্ষিক লাভ থাকে।

- Advertisement -

এছাড়া এটি এমন একটি ব্যবসা, যা খুব সহজেই করা যেতে পারে অর্থাৎ অনুকরণীয়। রিলায়েন্স রিটেল, অ্যামাজন, ফ্লিপকার্ট বিভিন্ন অনলাইন গ্রসারি শপ, সবারই হাতে সুদক্ষ কর্মী এবং নেটওয়ার্ক ও লজিস্টিক্স রয়েছে, যার সাহায্যে তারা একই ধরনের ব্যবসা করে যেতে পারে। এছাড়াও জোম্যাটোকে যে সমস্যার মুখে পড়তে হতে পারে, তা হল দেশের বিভিন্ন রেস্টুরেন্টের বিরূপতার মুখে পড়া। গত শুক্রবার বেলা অবধি যদিও জোম্যাটোর ইস্যু ১০ গুণ ওভার সাবস্ক্রাইবড হয়েছে। কোয়ালিফায়েড ইনস্টিটিউশনাল বায়ার্সরা (কিউআইবি) সাবস্ক্রাইব করেছেন প্রায় ২৪ গুণ। মার্কেটে যদিও খুব বেশি  হলে ১০ থেকে ২০ শতাংশ লিস্টিং গেনের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এটাও সত্যি যে, মিডিয়া যে পরিমাণ হইচই করছে এই কোম্পানিটাকে নিয়ে তারা সেটার দাবির যোগ্য কি না তা নিয়ে একটা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে নিফটি এবং সেনসেক্স খুব দ্রুতগতিতে ওপরে উঠছে তা নয়। তবে যেটুকু সংশোধন হয়েছে, তা অতি সামান্য। বলা যেতে পারে, শেয়ার বাজার একটু একটু করে শক্তি সঞ্চয় করছে ব্রেকআউটের জন্য। এর আগেও লিখেছি যে, নিফটি এবং সেনসেক্সের কোম্পানিগুলিতে নিউ এজ ইকনমি স্টকের স্থান পাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।  ব্যাংকিং এবং আইটি এতদিন শেয়ার বাজারের দুই ইনডেক্সকে টেনেছে। কিন্তু শুধু ম্যানুফ্যাকচারিং বা এফএমসিজি বা ফিনান্স স্টক নিয়ে নিফটি বিশাল লাফ দিয়ে এগোতে পারবে না। তাই নিফটির চরিত্র বদল নিয়ে ভাবনাচিন্তা করাই যেতে পারে। যদি লার্জ ক্যাপ থেকে মুখ ফিরিয়ে একটু স্মল বা মিড ক্যাপে নজর দেওয়া যায়, তাহলে বোঝা যাবে যে, বিনিয়োগকারীরা কীভাবে বিভিন্ন কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে চলেছেন।

শুক্রবার ফাস্ট সোর্স সলিউশনস, মতিলাল জসওয়াল, সিনজেন ইন্টারন্যাশনাল, অ্যাবট ইন্ডিয়া, সিডিএসএল, সায়েন্ট, আইআরসিটিসি প্রভৃতি তাদের ৫২ সপ্তাহের উচ্চতা ছুঁয়ে ফেলে। অন্যদিকে, নিফটি ৫০০-র মধ্যে কোনও শেয়ার ৫২ সপ্তাহের নিম্নস্তর ছোঁয়নি। এটা অবশ্য বুল মার্কেটের একটি বড় বৈশিষ্ট্য। শুক্রবার ষাটের বেশি শেয়ার তাদের ৫২সপ্তাহের উচ্চতম স্তর ছোঁয়। এর মধ্যে অ্যাঞ্জেল ব্রোকিং একদিনে ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পায় তাদের ত্রৈমাসিক ফলপ্রকাশের পর। তাদের লাভ ১৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১২১.৩৭ কোটি টাকা। গত সপ্তাহে ইনফোসিস এবং উইপ্রোও উল্লেখযোগ্য ফল করেছে। যে শেয়ারগুলিতে সামান্য সংশোধন এসেছে, তার মধ্যে রয়েছে এইচসিএল টেক, বন্ধন ব্যাংক, এলঅ্যান্ডটি ইনফোটেক, ব্যাংক অফ বরোদা ইত্যাদি। শুক্রবার সোনার দাম ছিল ৪০,২৮০ টাকা প্রতি ১০ গ্রাম (২৪ ক্যারেট)। রুপোর দাম ছিল ৬৯,৩৬৭ টাকা প্রতি কিলো। কাঁচা অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ছিল ৫,৩৮০ টাকা প্রতি ব্যারেল।

অর্থাৎ সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ এখনই কমছে না। অন্যান্য ধাতুর মধ্যে অ্যালুমিনিয়াম, কপার, নিকেল ইত্যাদির দাম ১ শতাংশ অবধি বৃদ্ধি পেয়েছে। মিউচুয়াল ফান্ডগুলি একগুচ্ছ নতুন এমএফও (মিউচুয়াল ফান্ড অফার) বাজারে এনেছে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যাক্সিস ফ্রোটার ফান্ড। এটা শুরু হয়েছে ১২ জুলাই এবং এতে বিনিয়োগের শেষ দিন ২৬ জুলাই ২০২১। ন্যূনতম বিনিয়োগ করতে হবে ৫ হাজার টাকা এবং এর কোনও এক্সিট লোড নেই। এটা একটি ডেট স্কিম, যা বিনিয়োগ করবে বিভিন্ন ফ্লোটিং এবং ফিক্সড রেট ইনস্ট্রুমেন্টসে। এছাড়া অন্যান্য নতুন এমএফওগুলির মধ্যে রয়েছে টাটা বিজনেস সাইকেল ফান্ড, কোটাক গ্লোবাল ইনোভেশন ফান্ড অফ ফান্ড ইত্যাদি। তবে আইপিও এবং এমএফওর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এমএফও কিন্তু বাজারে থাকা শেয়ারগুলিতেই বিনিয়োগ করে যা আগেই লিস্টেড রয়েছে।