অবিশ্বাস্য বুল রান দেখছে ভারতবর্ষ

250

বোধিসত্ত্ব খান : শেষ শুক্রবার সকালে বাজার খুলতে না খুলতেই নিফটি একটি ছয় মেরে পনেরো হাজার পার করল। চোখের সামনে স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার শেয়ারের দাম ট্রেড করছে তখন ১২ শতাংশেরও ওপর বৃদ্ধি পেয়ে পিএসইউ ব্যাংকগুলিতে সব যেন বুলের পরশ লেগেছে। ব্যাংক অফ বরোদা ৫ শতাংশ, ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া ৬ শতাংশ, ইন্ডিয়ান ব্যাংক ১০ শতাংশ। সরকারি ব্যাংকগুলিতে শেষ কবে এমন র্যালি হয়েছে তা বলা মুশকিল। নিফটি এবং সেনসেক্সে এই অবিশ্বাস্য র্যালির পিছনে অবশ্যই রয়েছে ব্যাংক নিফটির হাত। শুক্রবারও সকালে ব্যাংক নিফটি প্রায় তিন শতাংশ বৃদ্ধি পায়। শেয়ার বাজারে এই উত্থানের সময় মধ্যবিত্ত সোনার দাম কমতে দেখে একটু হলেও স্বস্তি পাচ্ছেন। ১০ গ্রাম সোনার দাম বেশ খানিকটা কমে হয়েছে ৪৬,৮০৯ টাকা (২৪ ক্যারাট)।

তবে গত এক মাস ধরে উদ্বেগ ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে জ্বালানি তেলের দাম। ওপেক (অর্গানাইজেশন অফ পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ) এবং রাশিয়া তেলের উৎপাদনে তেমন বৃদ্ধির সংকেত না দেওয়ায় সারা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। প্রতি ব্যারেল তেল এখন ৪,০০০ টাকার ওপর ট্রেড করছে। উপরন্তু তেলের দাম প্রতি লিটার ৩০ পয়সা করে বৃদ্ধি পাওয়ায় সমস্ত পণ্যের মহার্ঘ হওয়ার সম্ভাবনা থাকছে। তেলের দাম আওতায় না থাকলে শেয়ার বাজারে এই র্যালি দীর্ঘাযিত নাও হতে পারে। আরবিআই শুক্রবার তাদের এমপিসি (মানিটারি পলিসি কমিটি) মিটিংয়ে রেপো রেট ৪ শতাংশে এবং রিভার্স রেপো রেট ৩.৩৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখে।

- Advertisement -

আরবিআইয়ের গভর্নর বলেন যে, মূল্যবৃদ্ধি এখনও অবধি নতুনভাবে বৃদ্ধি না পাওয়ায় তাঁরা ভারতের আর্থিক বৃদ্ধির ওপরই বেশি জোর দেওয়ার কথা ভাবছেন। তিনি এফওয়াই (ফিসকাল ইয়ার) ২২-এ ভারতের জিডিপি বৃদ্ধি ১০.৫ শতাংশ হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেন। তবে তাঁর গলায় ক্রমবর্ধমান জ্বালানি তেলের দামের জন্য উদ্বেগ ধরা পড়েছে। ভারত সরকার যে বারো লক্ষ কোটি টাকা ধার করবে তার পর্যবেক্ষণ করবে আরবিআই। গর্ভনর এও বলেন যে, ব্যাংকগুলির মাধ্যমে এনবিএফসিগুলি অন-ট্যাপ টিএলটিআরওর সুবিধা পাবে, যার সাহায্যে আর্থিক সমস্যায় থাকা সেক্টরগুলি নতুন লোন পেতে পারে।

আরেকটি বড় ঘোষণা করেন আরবিআই গভর্নর। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এবার থেকে সরাসরি আরবিআই থেকে গভর্নমেন্ট সিকিউরিটিজ (জি-সেক) কিনতে পারবেন, সেটা প্রাইমারি বা সেকেন্ডারি মার্কেট হোক। এটা নিঃসন্দেহে একটি বিশাল পদক্ষেপ। কারণ ভারতের শেয়ার বাজার উন্নত হলেও সাধারণ মানুষের পক্ষে গভর্নমেন্ট সিকিউরিটিজের প্রতি আগ্রহ সেইরকম চোখে পড়েনি। একটি উন্নত দেশে শেয়ার এবং বন্ড মার্কেট দুটোই যথেষ্ট উন্নত থাকে। আরবিআইয়ের এই পদক্ষেপ ভারতীয় বন্ড মার্কেটকে আরও উন্নতির পথে নিয়ে যাবে। বর্তমানে ভারতের ১০ বছরের  (২০৩০) বন্ড ইল্ড চলছে ৬.১১৬ শতাংশ। বাজেট পরবর্তী কয়েকটি দিনে সেনসেক্স প্রায় ৪,০০০ পয়েন্টের ওপর উঠেছে। সরকার ভারতীয় অর্থনীতিকে টেনে তোলার জন্য যে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিচ্ছে, পরবর্তী সময়ে তার প্রভাব কীরকম হবে তা একটা চিন্তার বিষয় হয়ে রইল।

ভারতে ২০২০-র তথ্য অনুযায়ী ডেবট টু জিডিপি অনুপাত ০.৯-এর কাছে। মনে রাখতে হবে, ভারতবর্ষ তার প্রায় ১ বছরের রোজগার হারিয়েছে। পুরোনো অবস্থায় ফিরে যেতে অন্তত ৪ থেকে ৫ বছর আরও অপেক্ষা করতে হতে পারে সাধারণ মানুষকে। তবে বাজেট অনুযায়ী সরকার ভারতের পরিকাঠামোকে ঢেলে সাজাতে উদ্যোগী। তাই এবার সরকার খরচ করতে কার্পণ্য করবে না। বাজেটে বরাদ্দ অতিরিক্ত ৩৫,০০০ কোটি টাকায় লাভবান হবে ভারতীয় ফার্মা বা ওষুধ কোম্পানিগুলি। বাজেটে বণ্টন অনুযায়ী লাভবান হতে চলেছে সামুদ্রিক খাদ্য, ডেয়ারি, কৃষি, ইনফ্রাস্ট্রাকচার, হাউজিং ফিন্যান্স কোম্পানি, সিমেন্ট, হাউস বিল্ডিং মেটিরিয়াল, ফার্মা, ব্যাংক, ইনসুরেন্স, অটো, সোলার এনার্জি।

আশঙ্কা করা হয়েছিল যে, ভারত সরকার একটি কোভিড সেস চাপাতে পারে সাধারণ মানুষের ওপর। অবশ্য বাস্তবে তা হয়নি। নতুন করে কোনও কর চাপানো হয়নি। তবে ইনফ্রাস্ট্রাকচারে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে, তার একটা স্পিলিং এফেক্ট থাকবে। অ্যাফর্ডেবল হাউজিং লাভবান হবে। লাভ পেতে পারে রিয়েল এস্টেট। ভারতজুড়ে নতুন করে কয়েক হাজার কিলোমিটার রাস্তার বরাত দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে ব্যবসা বৃদ্ধি হতে পারে রোড কনস্ট্রাকশন কোম্পানিগুলির।

গত ৪ থেকে ৫ মাসে যে আইপিওগুলি এসেছে তা বুল মার্কেটের প্রভাবে দারুণ লাভ দিয়েছে বিনিয়োগকারীদের। রুট মোবাইল, হ্যাপিয়েস্ট মাইন্ড, মিসেস বেকটরস ফুড, বার্গার কিং, ইন্ডিগো পেন্টস, গ্ল্যান্ড ফার্মা এই সবগুলিই প্রায় বিনিয়োগকারীদের অর্থ দ্বিগুণ করে দিয়েছে। তবে এই আইপিওগুলিতে এত বেশি ওভার সাবস্ক্রিপশন হয়েছে যে, রিটেল বিনিয়োগকারীদের হাতে সেই অর্থে খুবই কম শেয়ার এসেছে। এটা প্রত্যাশিত যে, এই বুল মার্কেটে আরও বেশ কিছু নতুন কোম্পানির আইপিও আসবে।

মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে লার্জ ক্যাপ, ডাইভারসিফায়েড ইকুইটি, মাল্টি ক্যাপ এইগুলিতে তো বিনিয়োগকারীদের লাভ হয়েছেই, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোয়ালিটি মিড ক্যাপ মিউচুয়াল ফান্ডগুলি। গত পাঁচ বছরে বেশ কয়েকটি মিড ক্যাপ ফান্ড বিনিয়োগকারীদের দারুণ রিটার্ন দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যাক্সিস মিড ক্যাপ ফান্ড (ডিরেক্ট গ্রোথ ১৯ শতাংশ), টাটা মিড ক্যাপ গ্রোথ (ডিরেক্ট ১৬ শতাংশ)। স্মল ক্যাপ ফান্ডের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রিটার্ন দিয়েছে এসবিআই স্মল ক্যাপ ফান্ড (ডিরেক্ট গ্রোথ ২১ শতাংশ)। মাল্টি ক্যাপ ফান্ডের মধ্যে সাফল্য পেয়েছে ইউটিআই ইকুইটি ফান্ড (ডিরেক্ট গ্রোথ ১৮.৫ শতাংশ)।

যেসব বিনিয়োগকারী সোনায় বিনিয়োগ করতে চান অথচ স্বল্প পরিমাণে একটু একটু করে, তাঁরা ইচ্ছে করলে পেপার গোল্ড বা ইটিএফ (এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড) গোল্ডও কিনতে পারেন। তার জন্য অবশ্য একটা ডিম্যাট অ্যাকাউন্টের প্রয়োজন হবে। যাঁরা ইটিএফ ফান্ডে বিনিয়োগ করার কথা ভাবছেন, তাঁদের জন্য রয়েছে ব্যাংক বিস, এস অ্যান্ড পি, বিএসই ভারত ২২ ইনডেক্স ফান্ড, নিফটি কোয়ালিটি ৩০, নিফটি মিড ক্যাপ ১৫০, জি-সেক ১০ এনএসই ইনডেক্স, ন্যাসড্যাক ১০০ ইত্যাদি। এই ইটিএফগুলি বিগত এক যুগ বিনিয়োগকারীদের ভালো রিটার্ন দিয়েছে। যাঁরা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে লক্ষ রাখছেন শেয়ার বাজারের ওপর, তাঁরা বুঝতে পারছেন যে, বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক, আইটি, অটো, টেলিকম, এনবিএফসিগুলিতে অকৃপণভাবে বিনিয়োগ করেছেন এবং সে সব কোম্পানিতেও এখন বিনিয়োগ চলছে যেগুলিতে এতদিন বিনিয়োগকারীরা তেমন নজর দেননি, এখন সেগুলির দিকে তাঁদের নজর যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে আইটিসির কথা বলা যেতে পারে।

যেভাবে সেনসেক্স এবং নিফটি ওপরে উঠেছে, হতে পারে দুএকটা ছোট-বড় সংশোধন আসতে পারে শেয়ার বাজারে। তেমন সময় বিনিয়োগকারীরা পুনরায় ভালো মানের শেয়ার কেনার সুযোগ পাবেন। এছাড়া গত কয়েক মাসে বাজারে এফআইআই বিনিয়োগ যথেষ্ট সন্তোষজনক। সামনের কয়েকটি কোয়ার্টারে কোম্পানিগুলির ফলাফল উন্নতি করলে নতুন উচ্ছ্বাস নিয়ে শেয়ার বাজার ওপরে উঠতে পারে। বাজেটে যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে তা বাস্তবায়িত হবে কয়েক বছর ধরে। এই সময় শুধু এফআইআই নয়, অপেক্ষা থাকবে নতুন এফডিআই বিনিয়োগের। নতুন এফডিআই বিনিয়োগ অসংগঠিত সেক্টরে আর্থিক প্যাকেজ ভারতকে নতুন রাস্তা দেখাতে পারে।

এই সময়ে ভারতে মোট কর্মক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ রয়েছেন প্রায় ৪৫ কোটি। এর মধ্যে ৯০ শতাংশের ওপর মানুষ কাজ করছেন অসংগঠিত সেক্টরে। মহামারির সময় তাঁরাই ছিলেন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এই বিপুল পরিমাণ কর্মীসংখ্যার মধ্যে ৫ কোটি মানুষ হোটেল, রেস্টুরেন্ট এবং ছোট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ৫ কোটি মানুষ যুক্ত ছিলেন ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরে। ভারতের জিডিপি বৃদ্ধিতে তাঁদের ভমিকা কিন্তু অনস্বীকার্য। তাই মানুষকে মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনতে এঁদের পুনর্বাসনের আশু প্রযোজন রয়েছে। সামনের কয়েক বছরে এঁদের কর্মকাণ্ডই ভারতকে অনেক মাইল এগিয়ে নিয়ে যাবে। যেসব বিনিয়োগকারী প্রতি মাসে নিয়মিতভাবে একটু একটু করে বিনিয়োগ করে থাকেন, তাঁরা অবশ্যই লাভবান হবেন, এমনটি আশা করা যায়।