আলিপুরদুয়ার শহর ভাসানোর নেপথ্যে রেলের সাত কালভার্ট

128

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, আলিপুরদুয়ার : চারদিকে রেললাইন এবং নদী দিয়ে ঘেরা আলিপুরদুয়ার শহর। শহরের দুদিকে আছে ডিমা এবং কালজানি নদী, অন্যদিকে নোনাই। শহরের সীমানায় সমান্তরালভাবে রেখা টেনে দিয়েছে আলিপুরদুয়ার জংশন থেকে অসমগামী রেললাইন। সেই লাইন তৈরির জন্য জংশনের দিকে ভোলারডাবরি এলাকায় কিছুদূর পরপর মোট সাতটি কালভার্ট তৈরি করেছে রেল। আর বৃষ্টি হলেই সেই কালভার্টগুলি দিয়ে হুহু করে জল ঢুকছে শহরে। ভূমি সংস্কার দপ্তরের সমীক্ষা বলছে, জংশন এলাকার তুলনায় আলিপুরদুয়ার শহরের অন্যান্য অংশ অনেকটাই নীচু। তাই ভারী বৃষ্টি হলেই জল জমে যাচ্ছে শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে।
কালভার্টগুলির জল যাতে শহরে না ঢোকে তারজন্য দীর্ঘদিন থেকেই  মাস্টার প্ল্যান তৈরির দাবি উঠেছে। কালভার্টের পাশ দিয়ে খাল বা বড় নর্দমা তৈরি করে জল নোনাই নদীতে ফেলার দাবিও তুলেছেন কেউ কেউ। যদিও কোনও দাবিই গুরুত্ব পায়নি। ভোটের মুখে সেই দাবি ফের জোরালো হয়েছে। আলিপুরদুয়ার প্রবীণ নাগরিক মঞ্চের সম্পাদক ল্যারি বসু বলেন, বর্ষার আগেই সমস্যা মেটাতে পদক্ষেপ করুক প্রশাসন।

কালজানি নদীর ধার ঘেঁষে প্রায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ শহর রক্ষাকারী বাঁধ রয়েছে। সেই বাঁধের বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে স্লুইস গেট। বর্ষার সময় শহরের জমা জল নদীতে ফেলার জন্যই পরিকল্পনামাফিক গেটগুলি তৈরি করা হয়েছিল। সেচ দপ্তরের সমীক্ষা অনুসারে, কালজানি নদীবক্ষ শহরের তুলনায় উঁচু হয়ে গিয়েছে। তাই বর্ষার সময় স্লুইস গেটগুলি খুলে দিলে শহরের জল নদীতে যাওয়ার বদলে উলটে নদীর জল শহরে ঢুকে যাচ্ছে। ফলে রেলের কালভার্টগুলি দিয়ে যে জল শহরে ঢুকেছে তা কালজানি বা ডিমায় ফেলা যাচ্ছে না।

- Advertisement -

শহরের জমা জল নদীতে ফেলার জন্য শহরের মাঝ বরাবর নেতাজি রোড খাল নামে একটি খাল তৈরি করা হয়েছিল। শহর লাগোয়া অসম-জংশন রেললাইন থেকে শুরু হয়ে খালটি ২, ৩, ৫, ১৯, ২০ বিভিন্ন ওয়ার্ডের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে শান্তিদেবী স্কুলের পাশ দিয়ে বাসস্ট্যান্ডের কাছে খালটি কালজানি নদীতে মিশেছে। তবে বছরের পর বছর ধরে সংস্কারের অভাবে সেই খালের এখন বেহাল দশা। বিভিন্ন জায়গায় আবর্জনা জমে ভরাট হয়ে গিয়েছে। কোথাও অংশবিশেষ ভেঙে পড়েছে। বাসস্ট্যান্ডের কাছে যেখানে খাল নদীতে মিশেছে সেখানে একটি স্লুইস গেট আছে। নদীবক্ষ উঁচু হয়ে যাওয়ায় খালের জল গেট দিয়ে নদীতে ফেলা যাচ্ছে না।

শহরের দুই কিনারা দিয়ে আবার দুটি রেললাইন গিয়েছে। একটি লাইন আলিপুরদুয়ার জংশন থেকে নিউ কোচবিহার, অন্যটি নিউ আলিপুরদুয়ার থেকে অসমগামী লাইন। ফলে চারদিক থেকে উঁচু হয়ে যাওয়ায় আলিপুরদুয়ার শহরটি অনেকটা বাটির মতো আকার নিয়েছে। ২০১৪ সালে পুরসভার তরফে একটি প্রাথমিক সমীক্ষা করা হয়েছিল। সেই সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, রেলের কালভার্টগুলি থেকে ঢোকা জলই শহরে জল জমার অন্যতম কারণ। তত্কালীন পুরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন সিপিএমের অনিন্দ্য ভৌমিক। বিদায়ী বোর্ডের বিরোধী দলনেতাও ছিলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, রেলের কালভার্টের জল ঢোকা বন্ধ করতে না পারলে শহরে জল জমার সমস্যার সমাধান বাস্তবে সম্ভব নয়। কয়েক দফায় সেই সময় আমরা রেলের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তবে একটা মাস্টার প্ল্যান তৈরি করা জরুরি।

বিষয়টি নিয়ে তাঁরা পদক্ষেপ করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন পুরসভার প্রশাসকমণ্ডলীর চেয়ারম্যান মিহির দত্ত। তিনি জানিয়েছেন, শহরের নর্দমাগুলি দীর্ঘদিন পরিষ্কার করা হয়নি। আপাতত তাঁরা সেই কাজ শুরু করছেন। পাশাপাশি স্লুইস গেটগুলি সংস্কার করার পরিকল্পনাও গ্রহণ করেছেন। রেলের আলিপুরদুয়ার ডিভিশনের সিনিয়ার ডিসিএম অমরমোহন ঠাকুর জানিয়েছেন, রেললাইনের সুরক্ষার জন্যই কালভার্টগুলি তৈরি করা হয়েছে। সমস্যা খতিয়ে দেখে তাঁরা পদক্ষেপ করবেন।

ভোট আসে, ভোট যায়। তবুও মেটে না শহরের বাসিন্দাদের জল যন্ত্রণা। তাই কোনও প্রতিশ্রুতিতেই আর ভরসা করতে পারেন না সাধারণ মানুষ। প্রতিশ্রুতির গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আদৌ সমস্যা মেটাতে পদক্ষেপ হয় কি না সেটাই এখন দেখার।