দুর্গাপুজো এলে বাড়ির কথা মনে পড়ে ওঁদেরও

885

দিব্যেন্দু সিনহা  জলপাইগুড়ি : একসময় ওঁরাও বাবা-মার হাত ধরে পুজোয় ঘুরেছেন। ঠাকুর দেখার পাশাপাশি ভাইবোন, বন্ধুদের সঙ্গে খুনশুটি করেছে। সেই দিনগুলি এখনও চোখে ভাসে তাদের। ভাগ্যবিপর্যয়ে এখন তারা স্বাভাবিক জীবন, সমাজ থেকে অনেক দূরে। যখন সবাই পুজোর আনন্দে মেতে উঠছে, তখন ঘরের দুযারে বসে ছোটোবেলার সেই স্মৃতি হাতড়ে বেড়ান জলপাইগুড়ির টিনপাড়া এলাকার যৌনকর্মীরা। শারদোত্সব উপলক্ষ্যে জলপাইগুড়ি শহরজুড়ে এখন দোকানে দোকানে ভিড়। পুজোর চারদিন কে কোন পোশাক পরবে, কোন দিন কোন মণ্ডপে যাওয়া হবে, কোন রেস্তোরাঁয় খাওয়া হবে- এই আলোচনাতেই ব্যস্ত সাধারণ মানুষ। তখন ঘরের দুয়ারে খদ্দেরের অপেক্ষায় থাকা টিনপাড়ার তরুণীদের আক্ষেপ সমাজের চোখের আড়ালেই থেকে যায়।

দুর্গাপুজো এলে বাড়ির কথা মনে পড়ে ওঁদেরও| Uttarbanga Sambad | Latest Bengali News | বাংলা সংবাদ, বাংলা খবর | Live Breaking News North Bengal | COVID-19 Latest Report From Northbengal West Bengal Indiaকথা হচ্ছিল বছর বাইশের এক তরুণীর সঙ্গে। ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন এক ট্যাক্সিচালককে। কিন্তু ধারদেনায় জর্জরিত স্বামীই দেনা মেটাতে প্রথম তাকে এই পেশায় নামায়। প্রতিবাদ করেও রক্ষা মেলেনি। এরপর স্বামীই তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। এক ছেলে ও এক মেয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে শেষ অবধি যৌনকর্মীর পেশাই বেছে নিতে হয় ওই তরুণীকে। পুজো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুর্গাপুজোর সময় এলে বাড়ির কথা খুব মনে পড়ে। পুজোর কিছুদিন আগে মা, ঠাকুমারা নারকেলের নাড়ু এবং মুড়কি বানাতে বসত। চুরি করে নারকেলের নাড়ু খাওয়ায় মায়ে হাতে মারও খেতে হয়েছে। পুজোর বেশ কয়েকদিন আগে বন্ধুরা মিলে ঠিক করতাম, কবে কোন মণ্ডপে যাব। সারা বছর ধরে স্কুলের টিফিন খরচ বাঁচিয়ে জমানো টাকা দিয়ে ছয় বান্ধবী এটা-সেটা কিনে খেতাম। মা পুজোর সময় টাকা দিতেন। এখন কোথায় মা, কোথায় বান্ধবীরা? এক-একবার মনে হয় বাড়ি যাই। কিন্তু সমাজ মেনে নেবে কি?

- Advertisement -

অপর এক তরুণীর বাড়ি মুর্শিদাবাদের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে। কাজের প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমে দিল্লি, পরে পুনেতে নিয়ে গিয়ে তাঁকে বিক্রি করে দেওয়া হয়। সবশেষে স্থান হয় জলপাইগুড়ির টিনপাড়ায়। তিনি বলেন, ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়েছি। বাড়িতে অনটন থাকায় একজনের সঙ্গে কাজের জন্য গিয়েছিলাম। কিন্তু আমায় বিক্রি করে দেওয়া হয়। অবশেষে এখানে এসে পড়েছি। কিন্তু এত বছর পরেও ফেলে আসা পুজোর দিন আমাকে টানে। পুজো আসছে ভাবলেই মনে একটা আনন্দ হয়। পরিবারে অভাব থাকলেও পুজোয় বাবা নতুন জামা-জুতো কিনে দিত। নতুন জুতো নিয়ে বিছানায় শোয়ায় মায়ের কাছে পিটুনি খেতে হয়েছে। আবার মা পুজো দেখার জন্য প্রতি বছর, নিজের জমানো টাকা থেকে কিছু টাকা হাতে তুলে দিয়েছে। পুরুলিয়া থেকে আসা এক তরুণী যৌনকর্মীর পেশায় এলেও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। তাঁর বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা আর বিকলাঙ্গ ভাই আছে। তার পাঠানো টাকাতেই সংসার চলে। ওই তরুণী বলেন, পুজো এলে মনে পড়ে, ছোটোবেলায় ভাইয়ের সঙ্গে প্যান্ডেলে গিয়ে আলুকাবলি খেতাম। তবে এখন বাড়ি যাওযার উপায় নেই। উত্সবের মরশুমে খদ্দের বেশি আসে। তাই পুরোনো স্মৃতি মনে পড়লেও কিছু করার নেই। বাবা, মা, ভাইয়ে মুখে খাবার তুলে দিতে হবে তো।