পুজোয় শামিল শিলিগুড়ির যৌনকর্মীরাও

রাহুল মজুমদার, শিলিগুড়ি : ওঁদের দুয়ারের মাটি মানে পুণ্যমাটি। এই মাটি ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না দেবীর প্রতিমা। প্রতিমার শরীরে যাদের অবস্থান তাদের কিন্তু পুজোর সময়ও বাঁকা চোখেই দেখে তথাকথিত সভ্যসমাজ। তা নিয়ে অবশ্য কোনো খেদ নেই ওঁদের মনে। ওরা শিলিগুড়ির নিষিদ্ধপল্লির বাসিন্দা। ওরাও পুজোয় পরিবার নিয়ে ভালোভাবে বাঁচতে মা দুর্গার আশীর্বাদ চায়। সেইজন্য মহাষ্টমীর অঞ্জলি, সন্ধিপুজো, দশমীর সিঁদুর খেলায় শামিল হন নিষিদ্ধপল্লির চিন্ময়ীরা।

বছরের আর পাঁচটা দিনের থেকে পুজোর চারদিন একটু অন্যভাবেই কাটায় শিলিগুড়ির নিষিদ্ধপল্লি। সপ্তমীর দিন সকাল শুরু হয় গানবাজনার মাধ্যমে। সপ্তমীর সকাল থেকেই পল্লির প্রতিটি গলির মুখে বসানো হয় সাউন্ড বক্স। চারদিন ধরেই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে গান। সকালের দিকে স্নান সেরে সন্তানদের নিয়ে স্থানীয় পুজোমণ্ডপে গিয়ে প্রতিমা দর্শন করে আসেন মায়েরা। আবার কাজের সময় কাজ সেরে ফের বেশি রাতে সন্তান ও পরিবারকে নিয়ে পুজো দেখতে বের হন তাঁরা। তবে অষ্টমীর সকালে উপোস থেকে অঞ্জলি দেন অবশ্যই। শাড়ি পরে সন্তানদের নিয়ে চলে যান স্থানীয কয়লাডিপো সংলগ্ন পুজোমণ্ডপে। সকালে অঞ্জলি দিয়ে দুপুরে ভোগের প্রসাদ খেয়ে ফেরেন বাড়িতে। রাতে পরিবার নিয়ে রেস্টুরেন্টেও খেতে যান তাঁরা। তবে পুজোর চারদিন রাতের দিকে কাজের ব্যস্ততাও থাকে বলে জানিয়েছেন জয়া, উমারা। তাই দিনে সন্তানদের নিয়ে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরলেও রাতে তাঁদের কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়।

- Advertisement -

এর পাশাপাশিই এই চারদিন পাড়ায় মিষ্টিমুখেরও আয়োজন করা হয়। স্থানীয় ক্লিনিকের চিকিৎসক থেকে শুরু করে বিভিন্ন সমাজসেবী সংগঠনের সদস্যরাও পুজোর সময় পল্লির আবাসিকদের সঙ্গে খুশি ভাগ করে নেন। দুর্গাপুজোর আনন্দের পাশাপাশি দীপাবলিতেও আনন্দে শামিল হন পল্লির বাসিন্দারা। তবে পাড়ার মধ্যেই কালীপুজো করেন তাঁরা। সকাল থেকে উপোস করে পুজো করেন পাড়ার মহিলারা। সন্তান, পরিবারকে নিয়ে ভালো থাকার মানত করে দেবীর কাছে। পুজো উপলক্ষ্যে ইতিমধ্যে সন্তানদের জন্য পোশাকও কেনা শুরু করে দিয়েছেন তাঁরা। কেউ দুটো, কেউ চারটে, কেউ আবার পাঁচটা পোশাক কিনেছেন সন্তানদের জন্য। অনেকে আবার পুজোর চারদিন পরিবার নিয়ে কাটাতে চান। তাই ফিরে যান নিজের নিজের বাড়িতে। কেউ থাকেন সন্তান-পরিবার নিয়ে, কেউ থাকেন মেয়ে-জামাইয়ের সঙ্গে।

গত ১৮ বছর ধরে এই পল্লিতে রয়েছে জয়া (নাম পরিবর্তিত)। পুজোয় তিনি এবার মেয়ে-জামাইয়ের সঙ্গে আনন্দ করবেন। তিনি জানান, ছোটো থেকেই এখানে মানুষ। মেয়েকে পড়াশোনা করিয়ে বড়ো করেছেন। বিয়ে দিয়েছেন এখান থেকেই। উৎসবের দিনে মেয়ের কাছেই থাকবেন। গত ছয় বছর ধরে এখানে রয়েছেন অসমের উমা (নাম পরিবর্তিত)। বছর পাঁচের মেয়ের জন্য ইতিমধ্যেই পুজোর বাজার সেরে ফেলেছেন। তার কথায়, সন্তানের আনন্দেই আমার আনন্দ। তাই পুজোর চারদিন সন্তানকে আনন্দে রাখার চেষ্টা করি। দুর্বার মহিলা সমিতির তরফে মায়া দাস বলেন, শহরের অন্য পুজোর থেকে এখানকার পুজোটা আলাদা নয়। বরং আমাদের মনে হয় এই চারদিন ওরা মন খুলে বাঁচে।