মেচপাড়ায় বনদুর্গা হিসাবে পূজিতা হন শালেশ্বরীদেবী

286

পূর্ণেন্দু সরকার, জলপাইগুড়ি : জলপাইগুড়ির বৈকুন্ঠপুর রাজ্যের দ্বিতীয় রাজধানী ছিল বর্তমান বোদাগঞ্জের জঙ্গলের ভেতর। রাজ্যপাট থাকাকালীন বোদাগঞ্জের মেচপাড়াতেই ছিল শালেশ্বরীদেবীর থান। বৈকুন্ঠপুরের রাজা প্রসন্নদেব রায়কত হাতির পিঠে করে বৈকুন্ঠপুরের জঙ্গলে যাবার আগে এই দেবীর থানে পুজো দিয়ে যেতেন। আজ সেই শালেশ্বরীদেবীর থান শালেশ্বরী বনদুর্গা নামেই পরিচিত। দুর্গাপুজোর সময় দেবী মূর্তিকে রং করে পুজো দেওয়া হয়।

বোদাগঞ্জের মেচপাড়া এলাকাটি অনেকটাই উঁচু জায়গায় অবস্থিত। তিস্তা অনেক দূর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শালেশ্বরী মূলত শাল গাছ। এই গাছের গায়ে লাল কাপড় দিয়ে জড়িয়ে থানের জায়গা সিমেন্ট দিয়ে বাঁধাই করা হয়েছে। এখানে পুণ্যার্থীরা ধূপকাঠি, মোমবাতি জ্বালিয়ে যান। জলপাইগুড়ি শহর থেকে গোশালা পার করে ডেঙ্গুয়াঝাড় হয়ে ভ্রামরীদেবীর মন্দিরে প্রবেশের আগে বাঁ দিকে একটি রাস্তা মেচপাড়ার দিকে চলে গিয়েছে। ওই রাস্তায় এক কিমি এগোলেই চোখে পড়বে মেচপাড়ার শালেশ্বরী বনদুর্গা মন্দির। শালেশ্বরীর থানের মধ্যেই আলাদা মন্দিরে দেবী দুর্গার ছোটো আকারের বিগ্রহ আছে। এই বিগ্রহের পাশেই আছে প্লাস্টার অফ প্যারিসের তৈরি বনদুর্গার মূর্তি। বাঘের পিঠে চড়া অবস্থায় বনদুর্গা এখানে দশভূজা। বনদুর্গার পাশেই আছে নারায়ণ, গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী, শিব, বিশ্বকর্মার মন্দির, পীর বাবার থান।

বনদুর্গা মন্দিরের ৮৫ বছর বয়সি পুরোহিত গুলঞ্চ রায় জানান, আমার বয়স যখন ১৩ বছর তখন বোদাগঞ্জের এই মেচপাড়ার জঙ্গলে রাজা প্রসন্নদেব রায়কত হাতির পিঠে চড়ে আসতেন শালেশ্বরী থানে পুজো দিতে। পুজো দিয়ে তিনি শিকারে চলে যেতেন। এখন প্রতিদিন পুজো হয় দুর্গা ও বনদুর্গার মন্দিরে। বনদুর্গার মূল পুজো অঘ্রান মাসে হলেও দুর্গাপুজোর সময় দেবীর পুজো করা হয়। বর্ষীয়ান পুরোহিত গুলঞ্চ রায় জানান, শালেশ্বরীর থানের অনেক পরে বনদুর্গা, দুর্গার মন্দির হয়। শালেশ্বরীদেবীর থান বৈকুন্ঠপুরের রাজত্বকালের সময়কার। লোকের মুখে মুখে এখন একে শালেশ্বরী বনদুর্গা মন্দির বলেও প্রচার করা হয়।

মন্দিরের আর এক পুরোহিত অনিমেষ রায় জানান, বনদুর্গার বিগ্রহটি প্লাস্টার অফ প্যারিসের তৈরি। তাই দুর্গাপুজোর সময় বিগ্রহের শুধুমাত্র রং করা হয়। দুর্গার যে আলাদা ধাতব মূর্তি ছোটো মন্দিরে রয়েছে সেখানেও পুজো করা হয়। দুর্গার বিগ্রহে দেবীর সঙ্গে রয়েছে অসুর। সেখানে দেবী অসুর বধ করছেন অস্ত্র হাতে। কিন্তু বনদুর্গার বিগ্রহে দশ হাতে অস্ত্র পুজোর সময় দেওয়া হয়। জলপাইগুড়ির সাবেক বৈকুন্ঠপুর রাজ্যের অধীনে বর্তমান জলপাইগুড়ি সদর এবং রাজগঞ্জ ব্লকের বিভিন্ন এলাকায় থাকা মহারাজ ঠাকুর, চেউলিবাড়ির বনদুর্গার পর বোদাগঞ্জের মেচপাড়ার শালেশ্বরী বনদুর্গা মন্দির অন্যতম। স্থানীয় মানুষের মধ্যে এই দেবতাদের পুজো নিয়ে উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করার মতো।

লোকসংস্কৃতি গবেষকরা বলছেন, মূলত রাজবংশী অধ্যুষিত অঞ্চলেই শালবাগানের জন্য শালশিরি বা শালেশ্বরীর পুজো হয়ে থাকে। বৈকুন্ঠপুরের জঙ্গলে স্মরণাতীত কাল থেকেই শাল গাছকে নিজেদের রক্ষার্থে শালেশ্বরী বা শালশিরিদেবী হিসেবে পুজো করে আসছেন রাজবংশীরা। বন্যজন্তুর হাত থেকে রেহাই পেতেই শাল গাছের পুজো, বনদুর্গার পুজো করে থাকেন এই জঙ্গল লাগোয়া এলাকার মানুষ। অতীতে বৈকুন্ঠপুরের জঙ্গলে রাজাদের বাঘ শিকারের ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। তাই শালেশ্বরীর থানের পাশে বাঘের পিঠে বনদুর্গার পুজো করার ঘটনাও অস্বাভাবিক কিছু নয় বলে গবেষকরা মনে করেন।

বোদাগঞ্জের ঠিক কোথায় বৈকুন্ঠপুর রাজ্যের দ্বিতীয় রাজধানী ছিল তার ভৌগোলিক অবস্থান নির্ণয় করা মুশকিল। কারণ আজ সেই রাজধানীর কোনো ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া যায় না বলে প্রাবন্ধিক-গবেষক উমেশ শর্মার বক্তব্য। বোদাগঞ্জের মেচপাড়া এলাকা উঁচু জায়গায় অবস্থিত থাকায় একটা সম্ভাবনা থাকে যে ওই রাজধানী মাটির নীচে চাপা পড়ে আছে। চারদিকে আজও জঙ্গল থাকলেও আগের মতো অবশ্য গহন নেই।