প্রতিদিন কাকভোরে লড়াই শুরু হয় শম্পার

309

ভাস্কর বাগচী, শিলিগুড়ি : নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে স্বনির্ভর হতে লড়াই শুরু হয়েছিল বছর আটেক আগে। তখন সবে উচ্চমাধ্যমিক পাস করা মেয়েটার লক্ষ্য ছিল একটাই – যেভাবেই হোক, বাবা-মায়ের হাতে মাস গেলে কিছু টাকা তুলে দিতে হবে। এভাবেই শিলিগুড়ির অদূরে শালুগাড়ার বাসিন্দা শম্পা দেবরায়ের নতুন পথ চলা শুরু হয়। পাড়ার এক দাদার কাছ থেকে খবরের কাগজ বিলির কাজের খুঁটিনাটি সম্পর্কে জানতে পেরে আর দেরি করেননি। যোগাযোগ করে ১০০ খবরের কাগজ বিলির বরাত জুটে যায়। এরপর থেকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন শম্পার ব্যাগে থাকে ৫০০ খবরের কাগজ। মেডিকেল কলেজ এলাকা থেকে ১৪ কিলোমিটার স্কুটি চালিয়ে ভোর ৬টাতেই শালুগাড়া এলাকায় খবরের কাগজ বিলি শুরু করে দেন শম্পা। আর কাজ শেষ করতে করতে ঘড়ির কাঁটা পৌঁছে যায় বেলা ১১টায়।

কাকভোরে উঠে পুরুষ হকারদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একা একজন মহিলার পক্ষে খবরের কাগজ বিক্রি করার শুরুটা মোটেও সুখকর ছিল না শম্পার কাছে। অনেক সময় অনেক কটূক্তি শুনে হাসিমুখেই তা হজম করতে হয়েছে। আবার দেরি হলে গ্রাহকের যদি রাগ হয় আর কাগজ নেওয়া বন্ধ করে দেন, সেই আশঙ্কা থাকত সবসময়। আবার কেউ কেউ শম্পাকে উৎসাহ দিয়ে গিযেছেন। মূলত তাঁদের উৎসাহেই এখন প্রতিদিন ৫০০ বাড়িতে সকালে কাগজ পৌঁছে দেন তিনি। কিছুদিন আগেই বিয়ে হয়েছে শম্পার। মেডিকেল কলেজের কাছে শম্পার শ্বশুরবাড়ি। বাড়ির বউমা ভোরবেলা বেরিয়ে ১২টা নাগাদ বাড়ি ফিরে আবার সংসারটাও সামাল দেন সমানতালে। তাই শ্বশুরবাড়ির কারোরই তাঁর এই পেশা নিয়ে আপত্তি নেই।

শম্পার কথায়, উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর মনের মধ্যে একটা জেদ চেপে যায়, কিছু একটা করতে হবে। ডিটিপির কাজ জানি। সেই কাজই করতাম। কিন্তু একটা কাজে তখন আর হয়ে উঠছিল না। সেই সময় আমার এক পরিচিত দাদা, যিনি নিজেও কাগজের লাইন করেন, তিনি আমাকে এই খবরের কাগজ বিলির কথা বলেন। এরপর একজন পেপারের লাইন বিক্রি করলে আমি সেটা কিনে নিই। প্রথম প্রথম সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম ভোরবেলা। একটু লজ্জা লাগত। কিন্তু অনেকে আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন। যদিও অনেকে আবার কটূক্তি করতেও ছাড়েননি। মন খারাপ হয়ে যেত অনেকের কথা শুনে। কিন্তু ভাবলাম, আমি তো খারাপ কিছু কাজ করছি না। একজন মেয়ে যদি পাইলট হতে পারে তবে আমি পেপার বিলি করতে পারব না কেন? তবে বাবা-মা আমাকে ভীষণ উৎসাহ দিয়ে যেতেন।

শম্পা বলেন, শালুগাড়া এলাকায় সকালে আমিই প্রথম খবরের কাগজ দিই। এত সকালে কাগজ দিতে পারি বলে অনেকে আমার থেকেই এখন কাগজ নেন। আগে সাইকেল নিয়ে বিলি করতাম, কিন্তু গ্রাহকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এখন স্কুটিতে কাগজ বিলি করি। বিয়ের পর দুজন কর্মীও রেখেছেন শম্পাদেবী। কিছু কাগজ বিলি করে তাঁরা এখন শম্পাদেবীর কাজে সাহায্য করছেন। শম্পাদেবীর বক্তব্য, জীবনে লড়াইয়ে যখন নেমেছি তখন অনেক সমস্যাই থাকবে। তবে সবকিছু হাসিমুখে যদি মেনে নিতে পারি তবে কোনো সমস্যাই বেশিদিন থাকে না বলে আমার মনে হয়। তবে আমি খুশি হব, যদি আমার মতো আরও মেয়েরা এই পেশায় যুক্ত হন।