হেড হান্টার্সদের ডেরা থেকে মঙ্গোলিয়া, ঘুরছেন শিলিগুড়ির শান্তনু

145

দীপায়ন বসু, শিলিগুড়ি : হেড হান্টার্সদের কথা শুনেছেন? নাগাল্যান্ডে এই কুখ্যাত আদিবাসীদের বসবাস। শত্রুপক্ষের ওপর হানাদারি চালিয়ে তাদের মাথা কেটে নিজেদের হেপাজতে রাখাই ছিল এদের রেওয়াজ। শত্রুপক্ষের খুলি হত ঘরের শো-পিস। আজকাল অবশ্য এই হেড হান্টার্সদের সেভাবে দেখাই যায় না। দেখা পেতে হলে সেখানে সুদূরে মোন ভিলেজে যেতে হবে। তারপর সেখান থেকে আরও ২০ কিলোমিটার দূরে লোংওয়া। জঙ্গলের ভিতর দিয়ে গোটাটাই পাথুরে রাস্তা। প্রতি পদে বিপদের আশঙ্কা। স্মৃতি-ডায়ারিতে সবই সযত্নে সাজিয়ে রেখেছেন শিলিগুড়ির শিবমন্দিরের শ্রীনরসিংহ বিদ্যাপীঠের ইংরেজির মাস্টারমশাই শান্তনু রায়। সেই ডায়ারি ঘেঁটে বলছেন, অবশেষে স্বপ্নপূরণ। গোটা মুখ উলকিতে ভরা, প্রায় সমস্ত হাড় বুকের খাঁচা থেকে বের করে ফেলা ৯০ বছরের বেশি বয়সি এক হেড হান্টার যখন সামনে এসে দাঁড়ালেন, নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। শুধু মনে হচ্ছিল ঘুরে বেড়ানোর আমার প্যাশনটা এতদিনে সার্থক।

ঘুরে বেড়ানোর এই পোকাটা মাথাচাড়া দেওয়া সেই ছোটবেলায়। জন্ম আলিপুরদুয়ারে। বাড়ির পাশেই বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্প, জয়ন্তী পাহাড়, চা বাগান। দুই ভাইয়ের মধ্যে শান্তনু ছোট। বাবা প্রতি রবিবার সাইকেলে করে ছোট ছেলেকে গ্রাম,  জঙ্গল দেখাতে নিয়ে যেতেন। গাছ, পাখি চেনাতেন। ছেলেটি অবাক হয়ে দেখত। হাইওয়ের ধরে ছুটে চলা ট্রাকচালকদের দেখে ওদের মতো হওয়ার কথা ভাবত। ছোটটির ভয়ে বাবা স্কুটারের চাবি জুতোর মধ্যে লুকিয়ে রাখতেন।  তাতে কী? ছোটর যে তা জানা ছিল বিলক্ষণ। তাই একদিন সেই চাবি চুরি করে স্কুটার নিয়ে কালিম্পং পাড়ি। বাড়ি ফিরে আসার পর পিঠে উত্তমমধ্যম পড়লেও মুখে যুদ্ধজয়ের হাসিটা ছিল অম্লান।

- Advertisement -

হাইস্কুলে বিজ্ঞানের পডুয়া। গর্ব করে বলছেন, একটা দিনও ক্লাস করিনি। স্কুল ফাঁকি দিয়ে প্রতিদিন বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পে ঘুরে বেড়াতাম। কয়েকটা গেছো বন্ধু জোগাড় করে ফেলেছিলাম। সময়মতো আবার বাড়ি ফিরে আসতাম। স্কুলে খেলাধুলোটা বেশ ভালো করতেন। তাই স্যররাও বাড়িতে কিছু জানাননি। মাঝখানে শান্তনুর নিজের প্যাশনটার বাড়বাড়ন্ত। বাড়ির অজান্তেই বাইক নিয়ে এদিক-সেদিক পাড়ি জমানো শুরু। লাভা, লোলেগাঁও, কালিম্পং, সিকিমের আনাচ-কানাচ। জীবনের প্রথম বড় সফর বলতে গেলে উত্তর সিকিমের গুরুদংমার লেক। ২০০৭ সালে যখন সেখানে প্রথমবার যান, পাকা রাস্তা ছিল না। সেনাবাহিনীর গাড়ির চাকার দাগ দেখে সেখানে যাওয়া। এরপর ধীরে ধীরে সিকিমের সিল্ক রুট, ইয়ুমথাং, পশ্চিম সিকিমের রাবাংলা, পেলিং, নামচি, নাথুলা, নাথাং। অদ্ভুত শান্ত হিমাচলের স্পিতি ভ্যালিতে প্রায় তিন সপ্তাহ কাটিয়েছেন।

গিয়েছেন ভুটানের পারো, টাইগার্স নেস্ট, জাকার, বুমথাং, উরা গ্রামে। একবার সুযোগ হয় নেপাল দর্শনের। বাইক নিয়ে চলে গিয়েছিলেন সুদূর মুস্তাংয়ে। এরই ওপর বানান এ প্লেস কলড মুস্তাং নামে একটি ট্রাভেল ডকুমেন্টারি। দেশ-বিদেশের ১৪টি চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শন। এই সুবাদে শান্তনুর ঝুলিতে তিনটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার। এই তথ্যচিত্রের সুবাদেই মঙ্গোলিয়া পাড়ির সুযোগ। শান্তনু যেখানে যান নিজের বাইককেই সঙ্গী করেন। তবে বাইকে করে মঙ্গোলিয়া পাড়ি সহজ নয়। তাই বিমানে উলানবাতার পর্যন্ত গিয়ে সেখান থেকে একটি সস্তার বাইক কেনেন। এই বাইক সেখানকার যাযাবররা ব্যবহার করে। তারপর ১৮টি দিন সেখানে কাটানো। কেউ কারও ভাষা বোঝে না। সেখানকার বাসিন্দারা তাঁর সঙ্গে নিজেদের ভাষায় কথা বলেছেন আর শান্তনু বাংলায়। আজ হাসছেন, জীবনে সংকেতের গুরুত্ব কতটা তা এই সফরেই ভালোমতো বুঝতে পারি। মঙ্গোলিয়ায় জিপিএস কাজ করে না। এই সুবাদে বারবার রাস্তা হারিয়েছেন। এভাবে ২,১০০ কিলোমিটার পথ ইগল হান্টার্সদের গ্রামে পৌঁছানো। এরা এক অদ্ভুত মানুষ। ভেড়ার পালকে শিয়ালদের হাত থেকে বাঁচাতে ইগলদের ট্রেনিং দেয়। মঙ্গোলিয়া ভ্রমণকে ধরে শান্তনু নতুন তথ্যচিত্রও বানাচ্ছেন।

যেখানে সবাই ঘুরে যায় না, তিনি সেখানেই যেতে চান। চান অজানা উপলব্ধি করতে। ছবি তোলার হাতটা দারুণ ভালো। মিষ্টি হেসে বলছেন, ভাগ্যিস এই চাকরিটা পেয়েছিলাম। অন্য কোনও চাকরিতে তো এত ছুটির সুযোগ নেই। এভাবেই বেশ আছেন শিলিগুড়ি তথা উত্তরের শান্তনু।